প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা চললেও মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র এবং গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক রহস্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে তেহরানের অর্থায়নে পরিচালিত এবং মদদপুষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থের প্রবাহ ও সহায়তার সকল পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। কারণ হিসেবে ট্রাম্প সে সময় জোরালোভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, সশস্ত্র এসব প্রক্সি গোষ্ঠী অতীতে বহু মার্কিন সেনার নির্মম মৃত্যুর জন্য এবং অসংখ্য সেনার পঙ্গুত্ববরণের জন্য সরাসরি দায়ী ছিল। সেই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বর্তমানে রাশিয়া কর্তৃক ইরানকে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সহায়তা প্রদানের তথ্য প্রকাশ্যে এলেও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে একধরনের অস্বাভাবিক অনাগ্রহ ও খোঁজখবর নিতে অনীহা প্রকাশ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের শত সতর্কবার্তার পরও ট্রাম্পের এই চরম উদাসীনতা ও নমনীয় অবস্থান বর্তমান মার্কিন রাজনীতিতে এক দারুণ আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে এবং এটি তার দীর্ঘদিনের চেনা রাজনৈতিক আচরণেরই এক নিখুঁত ও পুনরাবৃত্ত রূপ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং চাঞ্চল্যকর সূত্রপাত ঘটেছিল গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেট কমিটির সামনে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া অফিসিয়াল সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সেই শুনানির সময় সিনেটরদের পক্ষ থেকে যখন সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে চীন এবং রাশিয়া যৌথভাবে বা এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা প্রদান করছে কি না, তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার জবাবে হ্যাঁ সূচক মন্তব্য করেছিলেন। এরপর হেগসেথ আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে এই পরাশক্তি দুটি দেশ নানা ধরনের কৌশলগত পথ এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইরানকে এমন কিছু অতি প্রয়োজনীয় সুবিধা বা বস্তুগত সহায়তা সরবরাহ করে চলেছে, যার সুবাদে তেহরান তাদের বর্তমান সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছে। ঠিক এর দুদিন পর আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের ঠিক বিপরীতে অত্যন্ত কাছাকাছি বসে থাকা অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে যখন একই বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যান এবং সরাসরি কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
পরবর্তীতে এই বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া লাগে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট প্রকাশ করেন। সেই পোস্টে তিনি তার নিজ প্রশাসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে প্রকাশ্যেই দ্বিমত পোষণ করেন এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থান তুলে ধরেন। ট্রাম্প তার মন্তব্যে লেখেন যে তার নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী চীন ও রাশিয়া বর্তমানের এই ইরান যুদ্ধে সরাসরি কোনো ধরনের অংশ নিচ্ছে না। এর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে তিনি দাবি করেন যে ওই দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা ব্যক্তিগতভাবে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে তারা তেহরানের কাছে কোনো ধরনের অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও যোগ করেন যে দেশ দুটি হয়তো সামান্য কিছু ছোটখাটো কাজ বা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি অন্তত কোনো বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় বা কৌশলগত হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা প্রকাশ করে ট্রাম্প আরও বলেন যে তার অন্তত এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের শীর্ষ নেতারা তাকে কোনো বিষয়ে হতাশ করতে চাইবেন বা তার দেওয়া আস্থার অমর্যাদা করবেন।
তবে হোয়াইট হাউসের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন আশ্বাসের কথা বলা হলেও মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা ভিন্ন এক বাস্তবতার কথা বলছেন। তাদের জোরালো বিশ্বাস ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মস্কো গোপনে হলেও ইরানকে উন্নতমানের ড্রোন এবং অত্যাধুনিক ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে আসছে, যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁত হামলা চালানো হচ্ছে। অবশ্য ক্রেমলিন শুরু থেকেই এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ তীব্রভাবে অস্বীকার করে আসছে। শুধু অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগই নয়, এর বাইরেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও বেশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি গুরুতর দাবি। তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে মস্কো কেবল অস্ত্র দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অতি গোপনীয় এবং নিখুঁত স্যাটেলাইট ইমেজ বা ছবিও সরবরাহ করেছে ইরানকে। ধারণা করা হয় যে ইরান পরবর্তীতে এই স্যাটেলাইট ইমাজিনারি বা গোয়েন্দা ছবির ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পেরেছিল, যার ফলে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
গত সোমবার সংবাদমাধ্যম এবং গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও পুরো বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন যে এই ধরনের সামান্য তথ্য বা স্যাটেলাইট ছবি কোনোভাবেই বাস্তব ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো প্রভাব ফেলতে পারত না। তবে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদতে সত্য কি না, তা নিজের মতো করে খতিয়ে দেখার একটি ছোট্ট আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন এবং সত্যতা জানার চেষ্টা করবেন। অথচ এর ঠিক বিপরীতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তথ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে অবগত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম সিএনএন এই সংক্রান্ত প্রথম অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে অর্থাৎ মার্চের শুরুতে। সেই প্রথম সারির প্রতিবেদনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করা হয়েছিল যে রাশিয়া গোপনে ইরানকে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সংক্রান্ত অতি সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এক বার্তা বহন করে।
পরবর্তীতে মর্যাদাপূর্ণ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকাতেও এই একই বিষয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দাদের উদ্বেগের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে নিয়োগকৃত শীর্ষ প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ সম্প্রতি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে তিনি নিজে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রাশিয়াকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যাতে তারা কোনো অবস্থাতেই ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ সংক্রান্ত কোনো ধরনের গোয়েন্দা তথ্য বা অন্য কোনো সামরিক সহায়তা প্রদান না করে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের এই কঠোর হুঁশিয়ারি বা কূটনৈতিক সতর্কতা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে কখনোই প্রকাশ্যে বা জনসমক্ষে এত দৃঢ় ও কড়া ভাষায় ক্রেমলিনকে এই বিষয়ে কোনো হুশিয়ারি উচ্চারণ করেননি, যা হোয়াইট হাউসের ভেতরে এবং বাইরে এক অদ্ভুত দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার পর চলতি মাসেই দুই দেশের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। এই দফার তীব্র সংঘাতে ইরানের নিক্ষিপ্ত ড্রোনের হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটেছে এবং আরও বহু সেনা গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিজ দেশের সেনাদের এমন করুণ মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির পরও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিষয়টিতে খুব একটা বিচলিত বা উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে না, যা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের রীতিমতো অবাক করে দিয়েছে। এই পুরো ঘটনার চিত্রটি হুবহু মনে করিয়ে দেয় ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালের সেই আলোচিত অধ্যায়টিকে, যখন আফগানিস্তানের মাটিতে কর্মরত মার্কিন সেনাদের নিশানা করার নেপথ্যে রাশিয়ার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিয়ে অত্যন্ত গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্য ওয়াশিংটনের টেবিলে এসে জমা হয়েছিল। সেবার গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে আফগানিস্তানে আমেরিকান সেনাদের হত্যা বা তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য রুশ গোয়েন্দা সংস্থা সম্ভবত স্থানীয় জঙ্গিদের জন্য বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছিল বা গোপনে অর্থায়ন করছিল। সে সময়ও ট্রাম্প সেই গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং একে একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ‘প্রতারণা’ ও ডেমোক্র্যাটদের সাজানো ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান সময়ের এই পরিস্থিতি এবং অতীতের সেই ঘটনার মাঝে এক অদ্ভুত ও গভীর মিল দেখতে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, যা প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে নিজের কূটনৈতিক সমীকরণ ও কৌশল বজায় রাখতে গিয়ে ট্রাম্প অনেক সময় নিজ দেশের গোয়েন্দা সতর্কবার্তাকেও ইচ্ছেকৃতভাবে এড়িয়ে যেতে দ্বিধাবোধ করেন না।