প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীর যোগদান নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা নতুন করে আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। আগস্ট মাসের মধ্যেই যোগদান ও বিদ্যালয়ে পদায়নের দাবিতে রোববার রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা। জাতীয় জাদুঘরের সামনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত প্রার্থী ব্যানার, ফেস্টুন ও নানা ধরনের স্লোগান নিয়ে জড়ো হন। তাদের বক্তব্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে কর্মজীবনের সূচনা যেমন বিলম্বিত হচ্ছে, তেমনি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিক সংকটও দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে।
রোববার সকাল থেকেই শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জেলা থেকে আগের রাতেই অনেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান। সকালে তারা জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে দ্রুত যোগদান ও পদায়নের দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীরা জানান, তারা কোনো নতুন দাবি নিয়ে মাঠে নামেননি। বরং চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে যোগদানের সুযোগ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রায় ১৭৫ দিন অতিক্রম হলেও এখনো নিয়োগপত্র হাতে পাননি তারা। নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী দ্রুত যোগদান সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে পুরো বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায়। এর ফলে হাজারো প্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
শিক্ষকরা দাবি করেন, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেকেই অন্য চাকরির সুযোগ ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ পারিবারিক ঋণের বোঝা বহন করছেন। আবার অনেকে বিয়ে, উচ্চশিক্ষা কিংবা জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়া মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর।
এর আগে শনিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষক নিয়োগ–সংক্রান্ত একটি জরুরি ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের জানান, তদন্ত এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত কারণে নিয়োগ কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে। তিনি সে সময় বলেন, আগামী ২৯ অক্টোবর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষককে যোগদান করানো হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে তাদের বিদ্যালয়ে পদায়ন এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
তবে এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতিতে নতুন মোড় আসে। রোববার সকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিদ্যালয়-২ শাখার উপসচিব রাজীব কুমার সরকারের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫’-এর চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীরা আগামী ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করবেন। যথাসময়ে তাদের নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। যোগদানের পর পদায়ন সম্পন্ন করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন তারিখ ঘোষণার পরও আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট নন। তাদের বক্তব্য, ১ অক্টোবরও তাদের কাছে অনেক দূরের সময়। তারা চান আগস্ট মাসের মধ্যেই যোগদান সম্পন্ন হোক। আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্মের অন্যতম নেতা দেবব্রত সরকার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করতে করতে অনেকেই চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বেকার অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আরও দুই মাস অপেক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। তাই আগস্টের মধ্যেই যোগদান ও পদায়নের বিষয়ে সরকারকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন জেলার সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব ও সেবামূলক পেশা। তারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের স্বপ্ন দেখছেন। নিয়োগ পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে শেষ করার পরও যোগদান করতে না পারায় তারা হতাশ। দ্রুত বিদ্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ পেলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তারা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট থাকলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্তদের দীর্ঘ অপেক্ষা প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তারা মনে করেন, তদন্ত বা প্রশাসনিক যাচাইয়ের প্রয়োজন থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা জরুরি, যাতে নিয়োগপ্রাপ্তদের অযথা ভোগান্তির মুখে পড়তে না হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। কিছু অভিযোগ এবং যাচাই–বাছাইয়ের কারণে সময় লেগেছে। তবে বর্তমানে প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী যোগদান সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে যোগদানের পর দ্রুত পদায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে তারা জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া দেশের ৬১ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত (এমসিকিউ) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক পদে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত নির্বাচনসহ সব ধাপ শেষ হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তারা যোগদান করতে পারেননি।
বর্তমানে আন্দোলনরত শিক্ষকরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা করছেন। তাদের মতে, আগস্টের মধ্যেই যোগদানের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা এলে পরিস্থিতির ইতিবাচক সমাধান সম্ভব হবে। অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবায়নে অনড় থাকবে নাকি আন্দোলনের মুখে নতুন সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট সবার নজরের কেন্দ্রে।