প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনৈতিক সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিরোধী মতের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে আবারও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, গত ১৭ বছরে বিরোধী দল ও মতের নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন সরকার ভুলে না যায়। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যে তিনি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধী দলের ভূমিকা, নির্বাচনী পরিবেশ এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের দলের অবস্থান তুলে ধরেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে যে দমনমূলক পরিবেশ বিরাজ করেছিল, জনগণ আশা করেছিল সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষায়, “আমরা নতুন কিছু দেখছি না। আগের ফ্যাসিস্ট সরকার যা করে গেছে, এখন তারই হুবহু ফটোকপি করা হচ্ছে। বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের চিত্রেও খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মনে রাখা উচিত, বিরোধী মত গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধী রাজনীতির সুযোগ নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করতে, যা ভবিষ্যতে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে।
বক্তব্যে তিনি জনগণের মতামতের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মতামত ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে কেন অগ্রাহ্য করা হচ্ছে? জনগণের মতামত উপেক্ষা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।” ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফলকে অগ্রাহ্য করার পরই দেশের ইতিহাসে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল, যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।
তবে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি বহুমাত্রিক জাতীয় আন্দোলনের ফল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাস্তবায়নে ব্যর্থতা সেই সংকটকে ত্বরান্বিত করলেও মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আরও বহু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ কাজ করেছে। ফলে এ ধরনের ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যকে সংশ্লিষ্ট বক্তার মতামত হিসেবেই দেখা উচিত।
জামায়াত আমীর তার বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের নির্বাচন নিয়ে মাঝে মাঝে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে। তবে তার দাবি, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জামায়াতের নিঃস্বার্থ সমর্থনের কারণেই বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করে গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল আচরণ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ছাড়া একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংলাপ ও আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর অন্যান্য নেতারাও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা না দেওয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান।
অন্যদিকে, এ বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং সংলাপের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং জনজীবনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের আরও মত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় থাকুক না কেন, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যে ইতিহাসের প্রসঙ্গ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার, বিরোধী দল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এ বিষয়ে কী ধরনের অবস্থান নেয়, তা আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।