১৩ বছরের মায়ের কোলে ফিরল ৭ মাসের সন্তান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার

প্রকাশ: ৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর হাজারীবাগে আলোচিত ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী মায়ের কোলে অবশেষে ফিরে এসেছে তার মাত্র সাত মাস বয়সী সন্তান। তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কর্তৃপক্ষ কিশোরী মাকে ফেসবুক, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির স্থায়ী অভিভাবকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পারিবারিক আদালতের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, বিদ্যমান আইন এবং সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আপাতত সাত মাস বয়সী শিশুটিকে তার মায়ের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মো. সায়েম খান জানান, বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী এত অল্প বয়সী শিশুর প্রাথমিক পরিচর্যা ও লালন-পালনের ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এটি স্থায়ী অভিভাবকত্বের সিদ্ধান্ত নয়। শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারণে বাবার করা আবেদন বর্তমানে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্ত হবে।

শুনানিতে কিশোরী মাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক করা হয়। বিশেষ করে ফেসবুক ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইন মেনে চলা, সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিশুর কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অপর পক্ষকেও।

লিগ্যাল এইড সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই মামলার মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা। তাই স্থায়ী অভিভাবকত্বের বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় লিগ্যাল এইড কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। আদালতের রায়ের আগে কোনো পক্ষই শিশুর স্থায়ী হেফাজতের দাবিকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করতে পারবে না।

সম্প্রতি এই কিশোরী মা ও তার সাত মাস বয়সী শিশুকে ঘিরে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টিকটকের মাধ্যমে এক ব্যক্তির সঙ্গে কিশোরীর পরিচয় হয়। পরে তাকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরবর্তীতে কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। একপর্যায়ে তার সন্তানকেও মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি ওঠে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গ্রহণ, আইনি দিক পর্যালোচনা এবং শিশুর কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শুনানির আয়োজন করা হয়। সেই শুনানির ফলেই আপাতত শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে আইনত বৈধ নয় এবং শিশু সুরক্ষা, পারিবারিক আইন ও অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে থাকে। বিশেষ করে সাত মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের সান্নিধ্য ও পরিচর্যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিভিন্ন আইনি ও মানবিক বিবেচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে একই সঙ্গে আদালত শিশুর নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ পরিবেশ এবং অভিভাবকদের সক্ষমতাও বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অল্প বয়সী কিশোর-কিশোরীরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সহজেই অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে, যা অনেক সময় প্রতারণা, নির্যাতন কিংবা অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারে সামাজিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোনো বিরোধ বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা যেন ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে, অনলাইন প্রতারণা এবং শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আইন বাস্তবায়ন আরও কঠোর করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইড জানিয়েছে, মামলাটি এখনো বিচারাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ভবিষ্যতে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমেই শিশুর স্থায়ী অভিভাবকত্ব নির্ধারিত হবে। ততদিন পর্যন্ত শিশুটির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পরিচর্যা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নজরদারি অব্যাহত রাখবে।

এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; বরং শিশু সুরক্ষা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিশুটির সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত