টাকা দাবির কল রেকর্ডে ক্লোজড পুলিশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২ বার
টাকা দাবির কল রেকর্ডে ক্লোজড পুলিশ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী ইউনিয়ন এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার চরম পেশাগত দায়িত্বহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অনৈতিকভাবে উৎকোচ বা টাকা দাবির একটি অডিও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অর্থাৎ ইউএনওর নাম ভাঙিয়ে অবৈধ উপায়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে এএসআই আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে। ঘটনার তীব্রতা, ব্যাপক জনরোষ এবং সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নড়েচড়ে বসে। ফলস্বরূপ, অভিযুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বাহুবল মডেল থানা থেকে প্রত্যাহার বা ক্লোজ করে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি রুহুল আমিন তালুকদার।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে স্থানীয় সূত্রে জানা যায় যে, অভিযুক্ত এএসআই আব্দুল মোতালেব বাহুবল মডেল থানার অধীনে পুটিজুরী ইউনিয়ন বিটের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিট কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত ১ আগস্ট শুক্রবার বিকেলের দিকে তিনি সরকারি দায়িত্ব পালনের কথা বলে পুটিজুরী ইউনিয়নের মিরেরপাড়া এলাকায় একটি বিশেষ স্থান পরিদর্শনে যান। স্থানীয় এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে গিয়ে তিনি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে বা কাউকে হাতেনাতে ধরতে পারেননি বা পাননি। কাউকে না পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল থেকে নিজ কর্মস্থলে ফিরে আসেন। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসার পরই তার মাথায় ফন্দি আঁটে কীভাবে এই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে অবৈধ আর্থিক সুবিধা আদায় করা যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় জনৈক এক সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক ছদ্মবেশ ধারণ করে ওই পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই মোতালেবের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে কল করেন। সেই ফোনালাপে বালু উত্তোলন সংক্রান্ত বিষয়ে উভয়ের মধ্যে কথপোকথন শুরু হয়। সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথন চলাকালে এএসআই মোতালেব অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বাহুবল উপজেলার সম্মানিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখান এবং বিষয়টি গোপন রাখার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। তিনি সরাসরি দেখা করে এই অনৈতিক বিষয়টি ‘সমাধান’ করার জন্য বারবার চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। কিন্তু ফোনদাতা সাংবাদিক সরাসরি সামনাসামনি দেখা করতে অপারগতা প্রকাশ করলে, ওই লোভী পুলিশ কর্মকর্তা আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি তখন সরাসরি বিকাশের মাধ্যমে গোপন নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং পরদিন পুনরায় সাক্ষাৎ করে বিষয়টি চিরতরে মীমাংসা করার জন্য তাগিদ দেন।

একজন রক্ষক হয়ে কীভাবে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি বা উৎকোচের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ মানুষের মনে। এই ফোনালাপের কথোপকথনটি পরবর্তীতে অতি গোপনে রেকর্ড করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হলে তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাহুবল উপজেলাসহ পুরো হবিগঞ্জ জেলায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সচেতন নাগরিক সমাজ, স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী এবং সাধারণ মানুষ এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এ ধরনের অসৎ ও দুর্নীতিবাজ সদস্যদের কারণে পুরো পুলিশের ভাবমূর্তি কীভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কল রেকর্ডটি ভাইরাল হওয়ার পর এবং সংবাদটি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও নজরদারি শুরু হয়। জনরোষ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার গভীর রাতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অভিযুক্ত এএসআই আব্দুল মোতালেবকে বাহুবল মডেল থানার পুটিজুরী বিটের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনে ক্লোজ বা সংযুক্ত করা হয়। বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ রুহুল আমিন তালুকদার সংবাদমাধ্যমকে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, পুলিশ বাহিনীতে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও পেশবহির্ভূত আচরণের ন্যূনতম কোনো স্থান নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত এএসআই আব্দুল মোতালেবের সঙ্গে মুঠোফোনে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন যে, জনৈক কোনো এক সাংবাদিক তাকে ফোন করেছিলেন ঠিকই, তবে তিনি সেই সাংবাদিককে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে তিনি বলেন যে, কলারের সঙ্গে তার কোনো আর্থিক লেনদেনের কথা হয়নি এবং বিকাশে কীসের টাকা দেওয়া বা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি নাকি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও কিছুই জানেন না। তার এমন আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা সাধারণ মানুষের কাছে চরম হাস্যকর ও দায়সারা বলে প্রতীয়মান হয়েছে, কারণ ভাইরাল হওয়া কল রেকর্ডের প্রতিটি শব্দে তার দুর্নীতিপরায়ণ ও লোভী রূপটি পরিষ্কার ফুটে উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য বর্তমান সময়ে এই ধরনের কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অবৈধ পন্থায় অর্থ আদায়ের পাঁয়তারা করেন, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাহুবলের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির অবাধ প্রসারের যুগে অপরাধী যেই হোক না কেন, তা আর দীর্ঘ সময় লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এএসআই মোতালেবের বিরুদ্ধে গৃহিত এই ক্লোজড বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সাময়িক মনে হলেও, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব হবে না। দেশের সাধারণ মানুষ এখন চায় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনার একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করার দুঃসাহস না দেখায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত