প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে পুরো দেশকে যখন ডিজিটাল অন্ধকার ও নিষ্ঠুর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কবলে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপন নম্বর এবং স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ও পলায়ন পর্বের যাবতীয় যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক টিমের দীর্ঘ ও নিবিড় অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার সেই গোপন টেলিকম নেটওয়ার্ক, কল রেকর্ড এবং দেশত্যাগের আগের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য এখন পুরোপুরি উন্মোচিত হয়েছে। সাংবাদিক আখলাকুস সাফা কর্তৃক সংগৃহীত ও বিস্তারিত বিশ্লেষিত এই চাঞ্চল্যকর তথ্যে বেরিয়ে এসেছে কীভাবে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের অধিকার কেড়ে নিয়েও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল এবং শেষ মুহূর্তে কোন গোপন পন্থায় দেশত্যাগ করেছিলেন তিনি।
সালটা ছিল ২০২৪। জুলাই অভ্যুত্থানে ফুঁসে ওঠা সিরাজগঞ্জ, ঢাকাসহ সারা দেশের রাজপথ যখন ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত, তখন সেই আন্দোলন কঠোরহস্তে দমাতে দেশজুড়ে নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সাধারণ নাগরিকদের ডিজিটাল যোগাযোগের সমস্ত পথ নির্মমভাবে বন্ধ করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হলেও রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সরকারি বাসভবন গণভবনে ইন্টারনেটের গতি বা সংযোগে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন ঘটেনি। দেশের সাধারণ মানুষ যখন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ধরনের অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বিশেষ ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে গণভবনের অন্দরে নিরবচ্ছিন্নভাবে হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার চালিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রযুক্তি দল ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা গণভবনের ছাদ থেকে টাওয়ার ডাম্প খুঁজে বের করে এর অকাট্য ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ উদ্ধার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশিষ্ট ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ওই সময় সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ডেটা লিংকের মাধ্যমে বিশেষভাবে কনফিগার করে গণভবনের ভেতরে নিরবিচ্ছিন্ন ও হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করা হচ্ছিল, যার মাধ্যমে তৎকালীন সরকারপ্রধান দেশি-বিদেশি সব ধরনের গোপন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করেছিলেন। মূলত ১ আগস্টেই পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর ঘনিষ্টজনেরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। পরবর্তী সময়ে ৩ আগস্ট দেশজুড়ে যখন একদফা আন্দোলনের চূড়ান্ত ঘোষণা আসে, তখন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার বশে তাঁর নিজস্ব ফোন থেকে অতি গোপনে যোগাযোগ করা হয় অন্তত সত্তরেরও অধিক সন্দেহজনক নম্বরে। আর এসব নম্বরের ফরেনসিক তদন্ত করতে গিয়ে আরও বড় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে, যার মধ্যে দেখা যায় এর অন্তত এগারোটি নম্বরের বিপরীতে নির্দিষ্ট নাম, ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে ওই নামের কোনো ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব বা অস্তিত্বের কোনো প্রমাণই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকায় গত ৪ আগস্ট নিজের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ও যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়ে মারাত্মক শঙ্কায় পড়েন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ সুরক্ষার চতুর উপায় হিসেবে তিনি তখন সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ফোন এবং গণভবনের অনুগত কিছু বিশ্বস্ত কর্মচারীর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহারের কৌশল বেছে নেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুসন্ধানে জানা গেছে যে, সেই জটিল ও সংকটাপন্ন মুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে তিনি সম্পূর্ণভাবে স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করেছিলেন এবং দিল্লি থেকে সাময়িক রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন। দিল্লির সবুজ সংকেত ও ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণভবনের অন্দরে শুরু হয় এক চটজলদি ও গোপন পলায়ন পর্ব, যা ইতিহাসের এক অন্যতম নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।
দিল্লির সুসংবাদ পাওয়ার পরপরই বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ এমআই-সেভেন্টিন হেলিকপ্টারে চড়ে শেখ হাসিনা এবং তাঁর বোন শেখ রেহানা মুহূর্তের মধ্যে কুর্মিটোলার এয়ার মুভমেন্টে গিয়ে পৌঁছান। উড্ডয়নের আগে কুর্মিটোলার সেই ভিআইপি রুমে কাটানো অত্যন্ত মূল্যবান ও থমথমে কুড়ি মিনিটে তিনি অত্যন্ত গোপনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ সম্পন্ন করেছিলেন। এর মধ্যে একটি ফোন কল করা হয়েছিল বিদেশে অবস্থানরত তাঁর মেয়ে পুতুলের নামে নিবন্ধিত একটি নম্বরে, তবে ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে সিম কার্ডটি বা নম্বরটি সেই মুহূর্তে দেশেই সক্রিয় ছিল। আরেকটি ফোনালাপ তিনি সেরেছিলেন হেলিকপ্টার উড্ডয়নের ঠিক এক মিনিট আগে, যা ছিল তাঁর শেষ মুহূর্তের পালানোর প্রস্তুতি সংক্রান্ত। এ ছাড়া অনুসন্ধান বলছে যে, ১ আগস্ট থেকেই পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের অত্যন্ত গোপনে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য নিরাপদ টেক্সট মেসেজ বা খুদে বার্তা পাঠাতে শুরু করেছিলেন শেখ হাসিনা, যদিও সেই সমস্ত বার্তা ও এসএমএসের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, শেখ হাসিনার এই গোপন ও সুরক্ষিত যোগাযোগের সমস্ত ডিজিটাল ট্রেইল এবং কল রেকর্ড চিরতরে মুছে ফেলার দায়িত্বে ছিলেন গুমের চাঞ্চল্যকর মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনাকর্তা জিয়াউল আহসান। তিনি ঢাকার জলসিড়ির একটি গোপন বাড়িতে সম্পূর্ণ আলাদা ও নিজস্ব একটি সার্ভার সিস্টেম বা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। এই বিষয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, ওই নির্দিষ্ট ভবনটিতে বিদ্যুৎ বিভাগের স্বাভাবিক কোনো সংযোগ বা সরবরাহ ছিল না, বরং জিয়াউল আহসান সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে জোরপূর্বক স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ বরাদ্দ নিয়েছিলেন। যার সহজ অর্থ দাঁড়ায় যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সেখানে একটি নিজস্ব ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল আয়নাঘর বা সার্ভার হাব বানিয়েছিলেন, যেখান থেকে পুরো দেশের ইন্টারনেট শাটডাউন এবং যোগাযোগের গোপন নেটওয়ার্কগুলো নিয়ন্ত্রিত হতো। পরিশেষে, জুলাই অভ্যুত্থানের সেই দিনগুলোতে ক্ষমতার অন্ধ মোহে যে গোপন টেলিকম সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিখুঁত ও আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির কল্যাণে আজ তার প্রতিটি কালো অধ্যায় একে একে জাতির সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।