ঐক্যবদ্ধ হলে দুর্ভেদ্য কাঠামোও বদলে যায়: ইউনূস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার
ঐক্যবদ্ধ হলে দুর্ভেদ্য কাঠামোও বদলে যায়: ইউনূস

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, দীর্ঘদিনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক জুলাই মাস। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং নোবেলজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে প্রদত্ত এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বাণীতে এই কথাগুলো উচ্চারণ করেন। আজ বুধবার (৫ আগস্ট) দেশজুড়ে যখন অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহের সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপিত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেওয়া এই বিবৃতিতে অধ্যাপক ইউনূস অতীতের সেই গৌরবময় দিনগুলোকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বিগত ২০২৪ সালের এই ঐতিহাসিক ৫ আগস্টেই দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছিল এবং ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন প্রতিরোধ ও দাবির মুখে ক্ষমতাচ্যুত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর পরপরই তৎকালীন সময়ে ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সুনির্দিষ্ট ও সাহসী নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল।

অধ্যাপক ইউনূস তাঁর এই বিশেষ বাণীতে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, গণমানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সুমহান গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জুলাই মাসটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ৩৬ দিনের অবিনশ্বর মাস হিসেবে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে এ দেশের আপামর জনসাধারণ আবারও নতুন করে স্মরণ করেছিল যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এ জাতি কতটা অপ্রতিরোধ্য এবং কী ভীষণ অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়ে তারা যেকোনো বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। আজকের এই বিশেষ ও পবিত্র দিনে অধ্যাপক ইউনূস অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন সেই সব তরুণ শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে, যাঁরা এই রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের বুলেট বুকে পেতে নিয়ে নিজেদের অমূল্য জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অসীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সেই বীর সেনানীদের প্রতি, যাঁরা রাজপথে পুলিশের গুলিতে ও হামলায় গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, চিরকালের মতো নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন কিংবা অঙ্গহানি বরণ করে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল মূলত সমাজের সর্বস্তরের, সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বগ্রাসী গণব্রোক—এমন মন্তব্য করে অধ্যাপক ইউনূস তাঁর বিবৃতিতে বলেন যে, এই অভূতপূর্ব আন্দোলনে দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে বুক চিতিয়ে রাজপথে নেমে এসে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তা বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। জুলাই মানেই কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, এটি ছিল সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন বুদ্ধিজীবীদের এক মহাজাগরণ, যাঁরা সংকটময় মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে সুদৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। অভ্যুত্থান চলাকালীন চরম বিপদের দিনেও যেসব নির্ভীক সাংবাদিক, মেধাবী আলোকচিত্রী এবং সাধারণ পথচারী নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে পুলিশের দমনপীড়নের প্রতিটি সত্য ঘটনা দেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে অবিকৃতভাবে তুলে ধরেছিলেন, তাঁদের অনন্য অবদানের কথাও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন অধ্যাপক ইউনূস।

বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বরেণ্য লেখক, স্বনামধন্য শিল্পী এবং দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা তাঁদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দীপ্ত কণ্ঠস্বর ও সৃজনশীলতার নান্দনিক প্রকাশ ঘটিয়ে এই গণ-অভ্যুত্থানকে আরও বেশি বেগবান ও শক্তিশালী করে তুলেছিলেন। এ দেশের খেটে খাওয়া রিকশাচালক, খেতমজুর, মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ এবং নানা পেশার পেশাজীবীরা নিজেদের সীমিত সামর্থ্য ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে যে যার অবস্থান থেকে এই ঐতিহাসিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ও যুদ্ধপরিস্থিতির মতো দিনগুলোতে দেশের চিকিৎসকরা যেভাবে চরম ঝুঁকি নিয়ে প্রতিটি আহত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্রতী হয়েছিলেন, তা মানবতার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। এমনকি ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও দূরপরবাস থেকে নানা উপায়ে নৈতিক ও আর্থিকভাবে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং স্ব স্ব প্রবাস রাষ্ট্রে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছেন।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে এ দেশের নারীরা যেভাবে বুক চিতিয়ে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে রাজপথে লড়াই চালিয়েছিলেন, তা আগামী দিনে দেশের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের নারীদের মনে গভীর অনুপ্রেরণা জোগাবে এবং তরুণ সমাজকে যেকোনো অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহস জোগাবে। এ দেশের ছাত্রসমাজের এই সুশৃঙ্খল ও অনন্যসাধারণ নেতৃত্ব ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরুণদের জন্য দেশপ্রেম ও সাহসিকতার এক চিরন্তন উৎসমূল হয়ে থাকবে। অধ্যাপক ইউনূস তাঁর বাণীর শেষাংশে অত্যন্ত আশাবাদী সুরে ঘোষণা করেন যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের একটি ঐতিহাসিক ও অবিনাশী শিক্ষা দিয়ে গেছে, আর তা হলো—যখন এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ সংকটের মুহূর্তে সব ভেদাভেদ ভুলে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তারা রাষ্ট্র ও সমাজের সবচেয়ে দুর্ভেধ্য ও পাথুরে বলে মনে হওয়া কাঠামোকেও মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে সক্ষম হয়। তাই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা যে নতুন গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রার শুভসূচনা করেছি, তা যেকোনো মূল্যে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের সবাইকে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত