প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি এবং ৫ আগস্ট জাতীয় মুক্তি দিবস উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল প্রবাসীর উদ্দেশে এক আবেগঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে প্রকাশিত এই বিশেষ বাণীতে তিনি স্মরণ করেছেন জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা, যে দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার অদম্য সাহসিকতা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মুখে দীর্ঘ সাড়ে ষোলো বছরের একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছিল। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত গভীর বেদনা ও আক্ষেপের সুরে উচ্চারণ করেছেন যে, যে মহান লক্ষ্য এবং অদম্য স্বপ্নকে সামনে রেখে এ দেশের তরুণেরা রাজপথে নিজেদের বুক পেতে দিয়েছিল, সেই শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা আজও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি।
বার্তার শুরুতে ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক এবং প্রবাসে অবস্থানরত রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও বাংলাদেশিদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন জানান। তিনি তাঁর সুদীর্ঘ বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্ট আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় এক অত্যন্ত গৌরবময়, রক্তস্নাত ও অবিস্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। ২০২৪ সালের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশের শিক্ষক, কোমলমতি শিক্ষার্থী, সচেতন অভিভাবক, তরুণ-তরুণী, শিশু, বৃদ্ধ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ সমস্ত ভয়ভীতিকে দূরে ঠেলে অভিন্ন দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সাধারণ মানুষের সেই স্বতঃস্ফূর্ত ও গণজোয়ার একপর্যায়ে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অদম্য এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
আন্দোলন দমনের নামে তৎকালীন ক্ষমতাধর সরকারের পেটোয়া বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার একাংশ কীভাবে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছিল, সেই ভয়াবহ চিত্রও নিজের বাণীতে তুলে ধরেছেন জামায়াত আমির। তিনি স্মরণ করেন যে, দেশের মুক্তিকামী ও অধিকারসচেতন মানুষ পুলিশের বুলেট, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং বর্বরোচিত দমন-পীড়নকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুমহান প্রত্যয়ে রাজপথ আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও লাখো জনতার প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের এক শ্বাসরুদ্ধকর একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের, যার ফলে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ মুক্তিকামী মানুষের বুক ভরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ আসে।
তবে এই বিশাল বিজয়ের পেছনে জাতিকে যে চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে, তার একটি মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছেন বিরোধীদলীয় এই নেতা। তাঁর ভাষ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে স্তব্ধ করতে গিয়ে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির কিছু অতিউৎসাহী সদস্যের নির্বিচারে চালানো গুলিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ। এর বাইরেও শত শত মানুষ চিরকালের মতো অন্ধত্ব বরণ করেছেন কিংবা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ হারিয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাণীতে তিনি বীর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিমসহ আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী প্রতিটি শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে যাঁরা আজ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, যেসব পরিবার তাঁদের প্রিয় স্বজনকে চিরতরে হারিয়েছেন এবং যাঁরা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় বলেন যে, ছাত্র-জনতার এই রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের মূল ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, সুশাসনভিত্তিক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও হতাশার সঙ্গে তাঁকে বলতে হচ্ছে যে, একটি বিশেষ মহলের সংকীর্ণ স্বার্থ এবং অনীহার কারণে শহীদদের সেই মহান প্রত্যাশা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে বিজয়ের এত দিন পরেও দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে ও দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শহীদদের পবিত্র রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে হলে শুধু মুখের বুলি নয়, বরং বাস্তবে একটি বৈষম্যহীন, পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাই হবে তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর একমাত্র পথ।
পরিশেষে, বার্তার শেষাংশে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দলমত ও অতীতের সব রাজনৈতিক বিভেদ চিরতরে ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, মানবিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে দলীয় সংকীর্ণতা পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। মহান আল্লাহর দরবারে দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও অগ্রগতি কামনা করে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক বার্তাটি সমাপ্ত করেন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।