প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও সুদৃঢ় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বাংলাদেশে সৌদি আরবের বিনিয়োগের মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সৌদি বিনিয়োগের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ওয়ালিদ এল-খেরেইজির নেতৃত্বে আসা উচ্চপর্যায় ও সসম্মানিত এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এক সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কারণে বাংলাদেশে এখন বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি জোরালো মন্তব্য করেন।
বৈঠকের শুরুতেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং উভয় পক্ষই বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার বিদ্যমান গভীর সম্পর্ককে কৌশলগত ও বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের এক নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির সংবাদমাধ্যমকে এই বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে বলেন যে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে দেশজুড়ে বেশ কিছু ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে চলেছে। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সৌদি আরবের স্বনামধন্য কোম্পানিগুলো যদি এগিয়ে আসে এবং বড় ধরনের বিনিয়োগ করে, তবে তা উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক কল্যাণের জন্য অত্যন্ত লাভজনক ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সাক্ষাৎকালে সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ওয়ালিদ এল-খেরেইজি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে বিনিয়োগের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, অনুকূল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে বলে অকপটে স্বীকার করেন। এই অনুকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও জোরদার করতে সৌদি আরব সরকার গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে আগ্রহী বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ও উদীয়মান খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগের পরিধি আরও সম্প্রসারণে সৌদি সরকারের সুমহান আগ্রহের কথাও তিনি বৈঠকে সজোরে তুলে ধরেন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে সৌদি আরবের সার্বিক আর্থসামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান খাতে অসামান্য অবদান রেখে চলা দক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠকের একটি বিশেষ ও আনন্দদায়ক মুহূর্তে সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং বাংলাদেশের এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাফল্যের উচ্চ প্রশংসা করেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সুদৃঢ় সম্পর্ক কেবল সাধারণ কূটনৈতিক সম্পর্কের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পারস্পরিক অটুট আস্থা, বিশ্বাস এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান সরকার মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রভাবশালী দেশটির সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি, কৌশলগত ও বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণের কল্যাণে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের এই আন্তরিক আহ্বানের ইতিবাচক জবাব দিয়ে জানান যে, সৌদি আরব বর্তমানে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প, সি-ফুড বা সামুদ্রিক মৎস্য খাত, ট্রপিক্যাল ফুড বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক বহুমুখী শিল্প, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছে। সৌদি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বিশাল বাজার ও জনশক্তির সদ্ব্যবহার করে এসব খাতে কাজ করতে উন্মুখ হয়ে আছে। দুই দেশের এই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আগামী দিনে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে উভয় পক্ষই দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই উষ্ণতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে সৌদি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আমন্ত্রণ সসম্মানে গ্রহণ করেন এবং আগামী দিনে সুবিধাজনক ও উপযুক্ত সময়ে সৌদি আরব সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বৈঠকে সৌদি প্রতিনিধি দলে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুলাইমান বিন আবদুল আজিজ আল-ইয়াহইয়া, কনস্যুলার বিষয়ক উপমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ আল-শাম্মারি, মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মুহান্নাদ বিন আহমেদ আল-ইসা, বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ বিন আবিয়াহ এবং দেশটির পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, যাঁদের সক্রিয় উপস্থিতিতে বৈঠকটি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়।