হেলিকপ্টারের গুলিতে নিহত আহসানের পরিবারের বিচার দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
হেলিকপ্টারের গুলিতে নিহত আহসানের পরিবারের বিচার দাবি

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

“বাবা, তুই বাইরে যাইস না”—২০২৪ সালের একুশে জুলাই সারা ঢাকা শহরজুড়ে যখন চারদিকে কেবল তীব্র সংঘাত, মুহুর্মুহু গুলির বিকট শব্দ এবং চরম এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজের স্নেহের সন্তান আহসান কবীর শরীফকে ঘরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য বারবার এভাবেই আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন মা খালেদা কবির। কিন্তু দেশের সেই দুঃসময়ে চলমান ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের নৈতিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে সব বাধা উপেক্ষা করে ঠিকই ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন মেধাবী তরুণ শরীফ। কে জানত যে, স্নেহের সন্তানের সেই প্রস্থানই হবে চিরকালের মতো বিদায় এবং নিয়তির এক নির্মম নিষ্ঠুর পরিহাসে তার সেই তাজা দেহটি আর কোনো দিন জীবিত অবস্থায় প্রিয় মায়ের কোলে ফিরে আসবে না। ঢাকার ডেমরা থানার দক্ষিণ সানারপাড় এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী এই তরুণ আহসান কবীর শরীফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন সম্পন্ন করার পর একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কর্মরত ছিলেন।

নিহত তরুণের পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ও চোখের জলে স্মরণ করেন সেই মর্মান্তিক দিনটির কথা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, চব্বিশের একুশে জুলাই দুপুরবেলা তিনি রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত সাইনবোর্ড এলাকায় সশরীরে অবস্থান করছিলেন এবং সে সময় চারপাশের ঘটে চলা ছাত্র-জনতার সেই গণআন্দোলনের নানা ঐতিহাসিক ও উত্তাল দৃশ্য নিজের মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন। কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বেলা তিনটার দিকে হঠাৎ করেই আকাশ দিয়ে চক্কর কাটা একটি সরকারি বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু হয় এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই আকস্মিক একটি বুলেট বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেলে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়ে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সন্তানের মৃত্যুর এমন আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বক্ষ্যমাণ পিতা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হুমায়ুন কবির পাগলপ্রায় হয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং নিজের চোখে ছেলের নিথর দেহটি রাজপথের ওপরে পড়ে থাকতে দেখেন। সেই মুহূর্তে চারপাশের চরম বিশৃঙ্খলার কারণে কোনো অ্যাম্বুলেন্স বা যানবাহন না পেয়ে অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে এক মানবিক সবজি বিক্রেতার ঠেলাগাড়িতে করে নিজ হাতে ভ্যান টেনে হাসপাতালে ছুটে যান এই হৃতসর্বস্ব পিতা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসককে তিনি তখন কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন, ‘আমার বুকের মানিক ছেলেটাকে বাঁচান ডাক্তার সাহেব।’ কিন্তু ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যখন অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে জানালেন যে তাঁর সন্তান আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই, সেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল একজন হতভাগ্য পিতার পুরো পৃথিবী।

শরীফের পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ করে বলা হয় যে, আহসান কবীর শরীফকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী পন্থী স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ও অসৎ ব্যক্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোনো পোস্টমর্টেম বা ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন করার জন্য পরিবারকে বেপরোয়া চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং ময়নাতদন্তের আইনানুগ প্রক্রিয়ায় না যাওয়ার জন্য নানা ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ও মেধাবী সন্তানকে হারানোর চরম শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও জীবননাশের তীব্র শঙ্কার মধ্য দিয়েই সেদিনই সুদূর মাগরিবের নামাজের ঠিক পরপর ডেমরার শুকুরসী স্থানীয় কবরস্থানে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় শহীদ আহসান কবীর শরীফকে। পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ও আইনানুগ বিচার চেয়ে নিহতের বাবা হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে দেশের প্রচলিত আইনে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা দায়ের করতে বাধ্য হন। বহুল আলোচিত ওই মামলায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এবং প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ আরও বেশ কয়েকজনকে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ও ঠাণ্ডা মাথায় হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে আহসান কবীর শরীফকে হত্যা করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে সেই অপরাধের সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ ধামাচাপা দিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে লাশ দাফন করার জন্য পরিবারকে জিম্মি করে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

ভয়ে ঘরে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আদর্শের জন্য বীরের মতো লড়াই করে আত্মত্যাগ করাকে অধিক শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা শহীদ আহসান কবীর শরীফের পরিবারে বর্তমানে রয়েছেন তাঁর শোকার্ত বাবা, গুরুতর অসুস্থ মা, দূর প্রবাসে কর্মরত এক বড় ভাই এবং একমাত্র বোন। পরিবারের সদস্যদের অবর্ণনীয় দুঃখের কথা বলতে গিয়ে মা খালেদা কবির জানান যে তাঁর হাঁটরে জটিল অপারেশন হওয়ার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পর্যন্ত পারেন না, অথচ প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে তাঁর সেই অসুস্থ মায়েদের পা নিজ হাতে পরম যত্নে মালিশ করে দিতেন আদরের শরীফ। পরিবারের যা কিছু প্রয়োজনীয় চাহিদা ছিল, তার সবকিছুই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে হাসিমুখে সুরাহা করতেন তিনি। মা আর্তনাদ করে বলেন, ‘আল্লাহ আমার বুক খালি করে আমার সোনাধন ছেলেকে কেড়ে নিয়ে গেছে, আমি এখন এই পৃথিবীতে একা মানুষ কেমন করে বেঁচে থাকব?’ অন্যদিকে নিহত শরীফের বোন রোকেয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আকাশ থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে যেন কোনো পশু-পাখি শিকার করা হচ্ছে, ঠিক সেই নির্মম কায়দায় আমার নির্দোষ ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর আমাদের পুরো পরিবারটি চিরতরে ভেঙে পড়েছে, বাবা ঘরে এক মিনিটও স্থির হয়ে থাকতে পারেন না, শোকে ও মানসিক যন্ত্রণায় তিনি কেবল বিভিন্ন জায়গায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ান।

পরিবার সূত্রে আরও জানা গেছে যে, মেধাবী তরুণ আহসান কবীর শরীফের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা দেওয়া হলেও তা কোনোভাবেই এই অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই শোকার্ত পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে দুই লাখ টাকা এবং সরকারি উদ্যোগে গঠিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাগরিক সংগঠন ‘উআর ভলান্টিয়ার’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহমেদুর রহমান তনু অত্যন্ত জোরালো মন্তব্য করে বলেন যে, আহসান কবীর শরীফের এই বেদনাদায়ক মৃত্যু আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সেই সময়ের চরম নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাঁর এই অসহায় পরিবারের মতো এ দেশের হাজার হাজার শহীদ পরিবার আজও ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত