ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচন করবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: প্রধানমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচন করবে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা চরম ফ্যাসিবাদী ও নিপীড়নমূলক শাসনামলে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর চালানো ভয়াবহ গুম, খুন, নির্যাতন এবং দমন-পীড়নের নির্মম ও কালো ইতিহাস চিরকালের মতো জাতির সামনে উন্মোচন করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ঐতিহাসিক জুলাই স্মৃতি জাদুঘর। বুধবার রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও উদ্দীপনামূলক এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে থাকা এই জাদুঘরটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে ফ্যাসিবাদের আসল ও পৈশাচিক মুখোশ চিরতরে উন্মোচন করে দেবে। আজকের এই পবিত্র ও ঐতিহাসিক দিনটি বাংলাদেশের যুগান্তকারী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে এবং একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নতুন যাত্রাপথ রচনা করবে।

বুধবার বেলা এগারোটার দিকে রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক গণভবন প্রাঙ্গণে নবনির্মিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। উদ্বোধনের এই বিশেষ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফিতা কেটে ও বেলুন উড়িয়ে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক শুভসূচনা করেন। এর আগে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মনোযোগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি, সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শন, সেসময়ের উত্তাল দিনগুলোর দুর্লভ আলোকচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র এবং শহীদদের বিভিন্ন স্মারক ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। জাদুঘরের প্রতিটি কক্ষে প্রদর্শিত ইতিহাসের নির্মম ও গৌরবোজ্জ্বল উপাদানগুলো পরিদর্শনের সময় এক গম্ভীর ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যা উপস্থিত সবাইকে আবেগতাড়িত করে তোলে।

অনুষ্ঠানের মূল পর্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর বীরত্বগাঁথা ইতিহাস এবং দেশের জন্য তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের নানা স্মৃতিচারণ করেন স্বয়ং জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের স্বজনেরা। তাঁদের বর্ণনায় সেদিনের সেই দুঃসাহসিক প্রতিরোধ ও স্বৈরাচার পতনের মুহূর্তগুলো নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি, ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পুরো ঘটনাপ্রবাহ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাসভিত্তিক একটি চমৎকার প্রামাণ্যচিত্র বড় পর্দায় প্রদর্শন করা হয়, যা দর্শকদের হৃদয়ে গভীর দেশপ্রেমের শিহরণ জাগায়। প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে রচিত বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বীর সেনানিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিগত দেড় দশকের ভয়াবহ ফ্যাসিবাদী শাসনের কথা স্মরণ করে বলেন যে, সেই অন্ধকার সময়ে দেশের জনগণ এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছে এবং অগণিত মুক্তিকামী মানুষ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে গুম ও খুনের নির্মম বলির পাঁঠা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, এ দেশের আপামর জনসাধারণের রক্তে অর্জিত এই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ আর কখনো কোনো দিন কোনো অদৃশ্য শক্তির তাবেদারি রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। জনগণের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় বর্তমান সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই প্রসঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে বলেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের এই বিশেষ দিনটিতে শুধু আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের যাতায়াত ও পরিদর্শনের জন্য সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবে আগামী দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে এই ঐতিহাসিক জাদুঘরটি দেশের সর্বসাধারণের সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ এসে স্বৈরাচারের সেই কালো অধ্যায় ও ছাত্র-জনতার বীরত্বের ইতিহাস নিজের চোখে দেখতে পারেন।

জাদুঘরে জনসাধারণের প্রবেশ এবং টিকিটের মূল্য প্রসঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এখানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুবিধার জন্য অনলাইনের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিটের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জাদুঘরটিতে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক বড়দের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে পঞ্চাশ টাকা এবং ছোটদের বা শিক্ষার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে পঁচিশ টাকা। উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় ও রক্তক্ষয়ী এক গণঅভ্যুত্থানের প্রবল ঢেউয়ের মুখে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চিরতরে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিন ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারের পতনের উল্লাসে তাঁর তৎকালীন সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে এবং এর বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক ভাঙচুর ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরবর্তীতে একই বছরের ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল। সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই পরবর্তীতে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং সেই গণভবনের ভেতরেই জুলাইয়ের যাবতীয় স্মৃতিচিহ্ন, শহীদের রক্তমাখা ও আন্দোলনের নানা দলিল সংরক্ষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা আজ পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত