ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ডাক ওয়াংচুকের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩ বার
ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ডাক ওয়াংচুকের

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। দেশটির স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের’ প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের’ ডাক দিয়েছেন।

ওয়াংচুক বলেছেন, ২০৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির সময় দেশকে একটি সম্মানজনক ও উন্নত অবস্থানে দেখতে হলে এখন থেকেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। তাঁর মতে, শুধু সরকার বা রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করলেই হবে না; নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই নতুন করে ভাবতে হবে।

ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন এমন ‘নিঃস্বার্থ, নির্ভীক, চরিত্রবান ও যোগ্য’ নারী-পুরুষকে সামনে আনার আহ্বান জানান। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে এমন ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার অনুরোধ করেন, যাঁরা দেশের নেতৃত্বে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

নিজের বার্তায় ওয়াংচুক জানান, গত কয়েক দিন অসুস্থ থাকায় তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছেন। সেই ভাবনা থেকেই তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন।

ভারতের অগ্রগতির সঙ্গে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনাও করেছেন তিনি। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ওয়াংচুক বলেন, কয়েক দশক আগে এসব দেশের অনেকগুলোই ভারতের তুলনায় পিছিয়ে ছিল অথবা কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাদের কেউ কেউ দ্রুত এগিয়ে গেছে। ভারতের বর্তমান গতিপথ অব্যাহত থাকলে ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ওয়াংচুকের বক্তব্যে শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল থাকলে দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা কঠিন হবে, আর এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতেও পড়বে।

সম্প্রতি শিক্ষা ও তরুণদের বিভিন্ন দাবি ঘিরে যে আন্দোলন ও প্রতিবাদ হয়েছে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওয়াংচুক আন্দোলনকারীদের অভিনন্দনও জানান। তাঁর দাবি, কয়েক মাসের প্রতিবাদের ফলে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন এসেছে। তবে শুধু মন্ত্রী পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় ধরনের সংস্কার সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ওয়াংচুক মনে করেন, ভারতের সমস্যাগুলোকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকার ক্ষমতায় থাকলেও শাসনব্যবস্থার কিছু মৌলিক সমস্যা থেকে গেছে। প্রতিবাদী কণ্ঠ দমন এবং অবিচারের অভিযোগও বিভিন্ন সরকারের সময় সামনে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০১২-১৩ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গও তোলেন ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্য, সেই সময় ব্যাপক জনআন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও দুর্নীতি ও অবিচারের সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে এসব সমস্যা নতুন রূপে আরও বড় হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এ কারণেই তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, নেতৃত্ব সঠিক না হলে পুরো দেশই ভুল পথে এগিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু নির্বাচনে দল পরিবর্তনের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, চরিত্র ও জনস্বার্থকে নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড করার বিষয়ে নাগরিকদের ভাবতে হবে।

ভারতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওয়াংচুক। তাঁর দাবি, সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা রয়েছে এবং তাঁদের একটি অংশের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকা মানেই তিনি অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন—এমন নয়। অভিযোগ ও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ওয়াংচুক মূলত এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মান ও জনআস্থার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তিনি আবারও স্পষ্ট করেছেন, তাঁর বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলছেন না; বরং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন ওয়াংচুক। ভারতের কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সেই পরিবর্তন কীভাবে আনা সম্ভব, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজ্য ও শহরের মানুষের মতামত নিতে চান তিনি। এ আলোচনায় শুধু বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষিত শ্রেণিকে নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ও যোগ্য মানুষদেরও যুক্ত করতে চান তিনি।

লাদাখে বসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন ওয়াংচুক। তিনি প্রত্যেক নাগরিকের কাছে অন্তত একজন এমন মানুষের নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানিয়েছেন, যিনি নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করতে পারেন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা ও চরিত্রের অধিকারী।

ওয়াংচুক জানিয়েছেন, এমন মানুষদের সঙ্গে তিনি কথা বলতে চান এবং তাঁদের নিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি বৃহত্তর চিন্তাভাবনা শুরু করতে চান। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করা নয়; বরং বিকল্প নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নাগরিক পর্যায়ে আলোচনা তৈরি করা।

তাঁর বক্তব্যে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’ শব্দবন্ধটি বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে ওয়াংচুক মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ধারণা সামনে এনেছেন। তিনি সহিংসতার বদলে নাগরিক অংশগ্রহণ, মতামত প্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ভারতের স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি হবে ২০৪৭ সালে। সেই সময় দেশটি কেমন অবস্থানে থাকবে, তা নিয়ে এখন থেকেই আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নাগরিক অধিকার এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা—সবকিছুকে একই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পর ভারতের সামনে নতুন করে যে প্রশ্নগুলো উঠে আসছে, ওয়াংচুকের বক্তব্য সেগুলোকেই সামনে এনেছে। তাঁর আহ্বান কতটা বৃহত্তর রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে তাঁর ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’-এর ডাক দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নতুন বিতর্কের সুযোগ তৈরি করেছে।

শেষ পর্যন্ত ওয়াংচুকের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভবিষ্যৎ ভারতের প্রশ্ন। স্বাধীনতার শতবর্ষে ভারত শুধু অর্থনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী হবে, তা নয়; দেশটির নেতৃত্ব কতটা যোগ্য, শিক্ষা কতটা কার্যকর, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জবাবদিহিমূলক এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় কতটা অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারছেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সেই পরিবর্তনের জন্যই শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক একটি নতুন আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত