প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আজ শুক্রবার শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও দলের মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজধানীর বঙ্গভবনের দরবার হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দেওয়া এই প্রবীণ নেতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হন মির্জা ফখরুল। ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫টি ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন। বিভিন্ন কারণে ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারেননি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট চলে। ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
ফলাফল ঘোষণার পর সংসদে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানান সংসদ সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও প্রবীণ নেতা হিসেবে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে বিএনপির রাজনীতির পাশাপাশি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা, ১৯৯১ অনুযায়ী তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এর ফলে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবারই আবার একাধিক প্রার্থী সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেন। ফলে সংসদে অনুষ্ঠিত এই ভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে নির্বাচন কমিশন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় তফসিল ঘোষণা করে। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল সংসদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলনের সময়ে তিনি দলের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নানা প্রতিকূলতা, আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও মির্জা ফখরুলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও রাজনৈতিক অনুপস্থিতির সময়ে এবং তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর্বে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দলটির মহাসচিব হিসেবে বিভিন্ন সময় সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংলাপ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ দায়িত্ব সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক কার্যক্রমে এই পদটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বঙ্গভবনে আজকের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আগেই জানিয়েছিলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। শপথ নেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন মির্জা ফখরুল।
একজন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়া মির্জা ফখরুলের সামনে এখন নতুন দায়িত্ব ও প্রত্যাশা। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁকে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সেই প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
গতকালের ভোটের ফলাফল মির্জা ফখরুলের প্রতি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্পষ্ট সমর্থন তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে অলি আহমদের প্রাপ্ত ৮৮ ভোটও দেখিয়েছে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব ছিল। ফলে এবারকার নির্বাচন শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘ সময় পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
আজ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করবেন। রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর এই অভিষেক দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—এমন প্রত্যাশাই এখন রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।