হিমবাহ গলছে, ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার
হিমবাহ গলছে, ঝুঁকিতে দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তা

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার প্রভাব শুধু নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও পানি নিরাপত্তার ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে হিমবাহ গলন, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় পুরো অঞ্চলকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, হিমালয়ের পরিবর্তিত পরিবেশ ও দ্রুত গলে যাওয়া হিমবাহ নেপালের জন্য যেমন উদ্বেগের কারণ, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর পানি ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। হিমালয়কে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান পানির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন অসংখ্য নদী বিভিন্ন দেশের কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের দায় ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নও সামনে এনেছেন। তার মতে, বিশ্বের বড় শিল্পোন্নত ও উচ্চ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় রয়েছে জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা নেপালের মতো দেশগুলোর প্রতি। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়েছে, অথচ এর সবচেয়ে কঠিন প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে তুলনামূলক কম নিঃসরণকারী উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো।

এই বাস্তবতায় নেপাল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে শুধু সহানুভূতি নয়, কার্যকর সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত অর্থায়নের দাবি জোরালো করছে। দেশটি ইতোমধ্যে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এর কাছে জরুরি আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় এই ধরনের আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করা হয়েছে।

নেপালের চাহিদা শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও দেশটির ব্যাপক অর্থায়ন প্রয়োজন। পাহাড়ি অঞ্চলের একটি বড় দুর্যোগ শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে না; সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করে এবং বহু মানুষের জীবিকার পথ বন্ধ করে দেয়।

সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালের রাশুয়া, নুয়াকোটসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও ধ্বংসস্তূপের কারণে অনেক স্থানে উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।

দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ওপরও। নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়ায় এই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিভিন্ন এলাকায় প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং শ্রমিকদের নিখোঁজ হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। পাহাড়ি অঞ্চলে একটি সড়ক বা সেতু ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু একটি জনপদ নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

নেপাল সরকারের প্রাথমিক মূল্যায়নে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় এই ব্যয় অত্যন্ত বড়। এর আগে নেপালের অর্থনৈতিক পর্যায়ের কর্মকর্তারাও পুনর্গঠন ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। সীমিত সম্পদ নিয়ে পরিচালিত একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন বিপুল অর্থের সংস্থান করা সহজ নয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো, প্রতিটি পৃথক দুর্যোগকে সরাসরি এবং চূড়ান্তভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে ঘোষণা করার আগে বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রেও ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণ কাজ করেছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। পাহাড়ের ঢাল ধসে ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া এবং এর সঙ্গে আকস্মিক বন্যা যুক্ত হওয়ার মতো ঘটনাও বিপর্যয়কে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

তবু বৃহত্তর বাস্তবতা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিমবাহের স্থিতিশীলতা পরিবর্তন করতে পারে, পাহাড়ি হ্রদগুলোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণে সময় লাগলেও সামগ্রিকভাবে হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন যে উদ্বেগজনক, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা বাড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই সংকট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিমালয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদী ও পানির উৎসের ওপর এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নগর ও গ্রামীণ জনপদের পানির চাহিদার সঙ্গে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

হিমবাহ দ্রুত গলে গেলে শুরুতে নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের আয়তন কমতে থাকলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ অতিরিক্ত পানি এবং পানির ঘাটতি—দুই ধরনের ঝুঁকিই ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে।

নেপালের সাম্প্রতিক অবস্থান তাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। দেশটির যুক্তি হলো, যেসব দেশ ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে, তারাই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য দিচ্ছে। পাহাড়ি রাষ্ট্র, দ্বীপ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশের মানুষ এমন একটি সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যার জন্য তাদের অবদান তুলনামূলকভাবে কম।

অন্যদিকে বড় অর্থনীতি ও শিল্পোন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের উচ্চ কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে পরিবেশবাদীদের দাবি। এই কারণেই ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। উন্নয়নশীল দেশগুলো বলছে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্থায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো জরুরি।

নেপাল এখন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন ও জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির সামনে মূল প্রশ্ন হলো—দুর্যোগের পর শুধু ত্রাণ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন কতটা স্বাভাবিক করা সম্ভব? একটি পাহাড়ি জনপদে রাস্তা, সেতু, স্কুল, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হলে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ছাড়া মানুষের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা কঠিন।

এ কারণেই নেপাল ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্বাসন, পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পাহাড়ি অঞ্চলে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, নিরাপদ অবকাঠামো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও নেপালের এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো একটি দেশের সীমান্তে আটকে থাকে না। পাহাড়ে হিমবাহ গলন, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন কিংবা উজানের বড় দুর্যোগের প্রভাব ভাটির দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে। তাই পানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন আরও বাড়ছে।

সব মিলিয়ে হিমালয়ের সাম্প্রতিক পরিবেশগত সংকট শুধু নেপালের একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পানি, খাদ্য, পরিবেশ এবং মানবিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় প্রশ্ন। নেপালের দুর্যোগ তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখারও লড়াই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত