প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যার পর নিত্যপণ্যের বাজারে যে মূল্যবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কমেনি। সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও শাকসবজি, মাছ-মাংস ও চালের দাম তুলনামূলকভাবে চড়া। এর মধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রশ্ন, বন্যার ক্ষতি সামলে ওঠার আগেই বাজারে নতুন করে দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম বড় কাঁচাবাজার বহদ্দারহাটে বাজার করতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাদুরতলা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ জেসমিন আকতার বলেন, নতুন করে আর কী দাম বাড়বে—এখনই তো সব জিনিসের দাম চড়া। বন্যার পর শাকসবজি ও মাছ-মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ার পর সেগুলোর দাম আগের অবস্থায় আর ফেরেনি।
বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদ আলমও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ালে তাঁদের আয় বাড়বে—এতে আপত্তি নেই। কিন্তু বেতন বাড়ার প্রভাব যদি নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ে, তাহলে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হবে বেসরকারি কর্মচারী ও সাধারণ কর্মজীবী মানুষের ওপর।
তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের বাজারে বেতন বৃদ্ধির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না পড়লেও সময়ের সঙ্গে তার প্রভাব দেখা দিতে পারে। তাই সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বহদ্দারহাটের মুদি দোকানি আমান উল্লাহ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খুচরা দামে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাঁর মতে, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেই মূলত খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়বে।
এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার কারণে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসল ও সবজির পাশাপাশি মাছ, মুরগি এবং গবাদিপশুর ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও খামারিরা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ফলে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বাজারকে জেলার বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পণ্যের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
সরবরাহ ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে বাজারদরেও। তবে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা নেজাম উদ্দিন জানান, বন্যার পর পণ্যের দাম হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এখন সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় দামও কমতে শুরু করেছে। তবে যে মাত্রায় দাম বেড়েছিল, সে তুলনায় কমার গতি এখনো কম।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক ধরনের সবজির সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। পটোল, শসা, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙা ও চালকুমড়া প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। বেগুনের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৮০ টাকা এবং শিম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা দরে।
মাছের বাজারেও দামের পার্থক্য বেশ বড়। তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই ও কাতলা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের রুইয়ের দাম কেজিতে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। মৃগেল বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, পোয়া ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা এবং ট্যাংরা প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে।
চিংড়ির দাম আকারভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। বাইম মাছ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কইয়ের দাম প্রায় ৩০০ টাকা। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ইলিশের দামও ক্রেতাদের জন্য কম নয়। প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৯০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। আর এক থেকে দেড় কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মুরগির বাজারেও দামের ওঠানামা রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দোকান ও বাজারভেদে এসব দামে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
চালের বাজারেও কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল আগে কেজিতে ৫১ থেকে ৫২ টাকা বিক্রি হলেও এখন ৫৬ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইজাম ও বিআর-২৮ ধরনের মাঝারি মানের চাল কেজিপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৭২ টাকা।
চিকন চালের মধ্যে নাজিরশাইল ৮২ থেকে ৮৫ টাকা এবং মিনিকেট ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা এবং গুটি ও চায়না ইরির মতো মোটা চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বন্যার পর স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় যে ধাক্কা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখনো বাজারে রয়েছে। সবজির সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও মাছ, মাংস ও চালের ক্ষেত্রে দাম পুরোপুরি কমেনি। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, পাইকারি বাজারের দাম এবং সরবরাহ পরিস্থিতিও খুচরা মূল্যে প্রভাব ফেলছে।
এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন চাপ তৈরি করবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু বেতন বৃদ্ধিকে পণ্যের দাম বাড়ার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। উৎপাদন, পরিবহন, পাইকারি বাজার, সরবরাহ এবং চাহিদাসহ একাধিক বিষয় খুচরা দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে ক্রেতাদের উদ্বেগ হলো, এসব কারণের সঙ্গে নতুন করে আয় বৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতন বা আয়ের ওপর নির্ভরশীল বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এতে বেশি চাপে পড়তে পারে।
বহদ্দারহাটের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তাই চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বাড়তে থাকা চাপের একটি চিত্র তুলে ধরছে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানো, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো—এই তিনটি বিষয় এখন ক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাজারে সরবরাহ বাড়লে এবং পাইকারি পর্যায়ে দাম কমলে খুচরা বাজারেও স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে সরকারি নীতির প্রভাব যেন নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ তৈরি না করে, সেদিকেও নজর রাখার দাবি জানাচ্ছেন ক্রেতারা।