প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বাড়তি অর্থের সংস্থান করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের উপায় খুঁজতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
গত ১ সেপ্টেম্বর এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ নির্দেশনা দেন বলে বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে সংস্থাটি ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল। সে হিসাবে নতুন লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের আদায়ের চেয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন অত্যন্ত কঠিন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে কখনোই ২৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির রেকর্ড নেই। এর মধ্যেই নতুন পে স্কেলের বাড়তি ব্যয় মেটাতে এনবিআরকে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উপদেষ্টা তাদের যেকোনো মূল্যে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। আরেক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর ফলে যে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে, তা রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমেই জোগানের কথা বলা হয়েছে।
সরকার সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করে। এর ফলে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় বাড়বে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর এই লক্ষ্য পূরণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং শিল্প উৎপাদনে বিঘ্নের কারণে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানি কমে যাওয়ায় আমদানি পর্যায় থেকে আদায় হওয়া শুল্ক ও করেও চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব পণ্য থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি শুল্ক আদায় করে, সেসব পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে নতুন অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে এনবিআরের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে।
সেপ্টেম্বর শুরু হলেও এনবিআর এখনো জুলাই মাসের রাজস্ব আদায়ের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে এ পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা।
সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, আগস্টেও ভ্যাট আদায় কমেছে। ওই মাসে ভ্যাট থেকে প্রায় ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যেখানে আগের বছরের আগস্টে আদায় হয়েছিল প্রায় ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের প্রাথমিক হিসাবেই ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য ঘাটতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা আরও জানান, আমদানি শুল্ক ও সংশ্লিষ্ট কর আদায়ও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন পে স্কেলের বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আদায়ের ওপর সরকারের নির্ভরতা এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ একদিকে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল থাকায় কর ও ভ্যাট থেকে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, এনবিআরের কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনুকূল নয়।
তার মতে, এনবিআরের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে এবং সংস্থাটিতে অর্থবহ সংস্কারের অগ্রগতিও সীমিত। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের দক্ষতার উন্নয়ন, করের আওতা বাড়ানো এবং নতুন করদাতা শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগের নিম্নগতি এবং শিল্প খাতের সংকোচনের পাশাপাশি নতুন করে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। আমদানিও কমেছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি দুর্বল হলে স্বাভাবিকভাবেই ভ্যাট ও আয়কর আদায়েও তার প্রভাব পড়ে।
নতুন পে স্কেলের বাড়তি ব্যয় মেটাতে এনবিআরকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো, করের ভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনার মতো পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর বিপরীতে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। সেই বাড়তি ব্যয় রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে টেকসইভাবে বহন করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন অর্থ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা এবং নতুন পে স্কেলের বাড়তি ব্যয়ের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হওয়ায় আগামী মাসগুলোতে রাজস্ব আদায়ের গতি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।