প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৮০

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৮০

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার কুমিল্লা, পটুয়াখালীর গলাচিপা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে এসব ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষে বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের নেতাকর্মীসহ অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও দলীয় নেতাকর্মীদের বরাতে জানা গেছে। কোথাও কোথাও দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন, ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ, যানবাহন ভাঙচুর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

একই দিনে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে একাধিক এলাকায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে আসায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনার বিষয়ে পুলিশ ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ডে ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনাগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পটুয়াখালীর গলাচিপায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফার অনুসারী এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বহিষ্কৃত সদস্য হাসান মামুনের অনুসারীরা পৃথক কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা পৌর শহরের ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন।

দুপুরের দিকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে একটি র‍্যালি দলীয় কার্যালয় থেকে বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। অন্যদিকে হাসান মামুনের অনুসারীরাও পৃথক র‍্যালি বের করেন। দুটি পক্ষের কর্মসূচি কাছাকাছি এলাকায় চলে আসার পর উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে শহরের বটতলা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় বলে স্থানীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি একপর্যায়ে গলাচিপা পৌর শহরের কালীবাড়ি, হাইস্কুল রোড, বটতলা ও ফিডার রোডসহ কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। নিরাপত্তার কারণে অনেক ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ করে দেন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে ঘিরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরের দিকে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের উত্তর বাইপাস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুই পক্ষ পৃথক কর্মসূচি আয়োজন করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তাদের কর্মসূচির সময় আলাদা করে দেয়। এক পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মসূচি শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও অপর পক্ষের নেতাকর্মীরা আগেই একটি কনভেনশন সেন্টারের সামনে অবস্থান নেন। অন্য পক্ষের নেতাকর্মীরাও কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

দুপুরের দিকে একটি পক্ষের মিছিল অপর পক্ষের অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পাশাপাশি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শোনার অভিযোগও পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের সময় কয়েকজন নেতাকর্মীর হাতে দেশীয় অস্ত্র দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও ধাওয়া দেয়। এ সময় তিনটি মিনিবাস ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।

তবে সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিনুল ইসলাম ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে স্বীকার করেননি। ফলে এ ঘটনার বিভিন্ন দাবি নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরেও বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা সদরের জমজম টাওয়ার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলীর অনুসারীদের উদ্যোগে জমজম টাওয়ার এলাকা থেকে আনন্দ মিছিল বের করার কর্মসূচি ছিল। অন্যদিকে বিএনপির আরেক পক্ষ বিকেলে শ্রীনগর স্টেডিয়ামে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সরফত আলীর অনুসারীরা সকালে কর্মসূচিতে অংশ নিতে জমজম টাওয়ার এলাকায় জড়ো হতে থাকেন। এ সময় অন্য পক্ষের কয়েকজন নেতাকর্মী ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হন।

তবে শ্রীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুয়েল মিয়া পুলিশের কোনো সদস্য আহত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রে পুলিশ কর্মকর্তাসহ কয়েকজন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে আহতের সংখ্যা ও পরিচয় নিয়েও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

কুমিল্লার লালমাই উপজেলাতেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার বিকেলে বাগমারা রেলগেট ও আশপাশের এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা ছিল। কর্মসূচি চলাকালে বিরোধ তীব্র হলে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে একটি পক্ষের নেতার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতারা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‍্যালিতেও দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। শহরের মিশনপাড়া এলাকা থেকে র‍্যালি বের হয়ে চাষাঢ়ার সমবায় মার্কেটের সামনে পৌঁছালে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনায় বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাধারণত সংগঠনের ঐক্য, রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কিন্তু একই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকে সংঘর্ষের ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন বার্তা তৈরি করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব, কর্মসূচি আয়োজন এবং আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলে তা বড় কর্মসূচির সময় প্রকাশ্যে চলে আসার ঝুঁকি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে সেই মতপার্থক্য যখন সংঘর্ষ, অস্ত্র প্রদর্শন, ভাঙচুর বা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা শুধু দলের ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্য জড়িত থাকায় সংঘর্ষের প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

গলাচিপায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সীতাকুণ্ডে যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগ তারই উদাহরণ। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে দলীয় নেতৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে ঘিরে সংঘর্ষের এসব ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা, ভাঙচুরের অভিযোগ এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখা এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দলীয় পর্যায়ে বিরোধ নিরসন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচিতে সমন্বয় বাড়ানো না গেলে এ ধরনের উত্তেজনা আবারও দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো দলটির স্থানীয় পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে সামনে এনেছে। কোথাও ৪০ জন, কোথাও ২০ জন এবং অন্য এলাকাগুলোতে আরও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় প্রকৃত দায় কার, সংঘর্ষ কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত