প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যে রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্ক হত্যা মামলায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন ২৩ বছর বয়সী টাইলার রবিনসন। মঙ্গলবার প্রোভো শহরের আদালতে হাজির হয়ে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে আদালত জানিয়েছে, মামলার বিচার চলাকালে রবিনসনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করার সুযোগ প্রসিকিউশনের রয়েছে।
চার্লি কার্ক হত্যার ঘটনায় রবিনসনের বিরুদ্ধে গুরুতর হত্যাসহ মোট সাতটি অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইউটাহ ভ্যালি ইউনিভার্সিটির ওরেম ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ৩১ বছর বয়সী কার্ক। তাঁর মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এক বছর পার হতে চললেও মামলার মূল বিচার এখনো শুরু হয়নি।
মঙ্গলবারের শুনানিতে রবিনসনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করার বিষয়টি আদালতে গুরুত্ব পায়। তাঁর আইনজীবীরা এর আগে মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা বাতিল করার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রসিকিউশন সেই আবেদনের বিরোধিতা করে জানায়, জনসমাগমের মধ্যে, এমনকি শিশুদের উপস্থিতির সময় গুলি চালানোর মতো গুরুতর পরিস্থিতির কারণে মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
চার্লি কার্ক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক সংগঠন টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর সহপ্রতিষ্ঠাতা। তরুণদের মধ্যে রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ইউটাহ ভ্যালি ইউনিভার্সিটির ওরেম ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তাঁর ঘাড়ে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় পরে তিনি মারা যান।
মঙ্গলবার প্রোভো শহরের আদালতে রবিনসন ধূসর রঙের স্যুট পরে হাজির হন। শুনানির সময় তাঁকে মাঝেমধ্যে তাঁর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। আদালতকক্ষে কার্কের স্ত্রী এরিকা, তাঁদের দুই সন্তান এবং কার্কের বাবা-মা রবার্ট ও ক্যাথরিন উপস্থিত ছিলেন। প্রিয়জনকে হারানোর দীর্ঘ শোকের মধ্যেও তাঁদের আদালতে উপস্থিতি মামলাটির মানবিক দিকটিকে সামনে নিয়ে আসে।
শুনানি শেষে কার্কের পরিবার এক বিবৃতিতে আদালতের সিদ্ধান্তকে ন্যায়বিচারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে। পরিবার জানায়, কার্কের হত্যার ফলে তাঁদের জীবনে যে গভীর ক্ষতি তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। বিশেষ করে তাঁর দুই সন্তান বাবাকে ছাড়া বড় হচ্ছে—এ বিষয়টি পরিবারের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করা হয়।
মামলার প্রাথমিক শুনানি গত জুলাইয়ে পাঁচ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়। ওই শুনানিতে প্রসিকিউশন রবিনসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ আদালতে তুলে ধরে। প্রসিকিউশনের দাবি, ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্র এবং অন্যান্য সামগ্রীতে রবিনসনের ডিএনএ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির কাছে তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রসিকিউটর রায়ান ম্যাকব্রাইড মঙ্গলবার আদালতে বলেন, রবিনসনের বিরুদ্ধে ভিডিও ফুটেজ, ডিএনএ এবং কথিত স্বীকারোক্তিসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রমাণ রয়েছে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার দিন ক্যাম্পাসে রবিনসনের গতিবিধি এমন ছিল, যা থেকে ধারণা করা যায় যে তিনি হামলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
প্রসিকিউশন আরও দাবি করেছে, হত্যার দিন রবিনসন একাধিকবার ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলেন এবং খাবার খান। পরে পোশাক পরিবর্তন করে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের মতে, তিনি এমন ধরনের লম্বা প্যান্ট পরেছিলেন যার ভেতরে একটি রাইফেল লুকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর ক্যাম্পাসের কাছে লুকিয়ে রাখা একটি রাইফেলে রবিনসনের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলেও আদালতে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। রাইফেলটি যে তোয়ালে দিয়ে মোড়ানো ছিল, সেখানেও তাঁর ডিএনএ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা একটি স্ক্রু-ড্রাইভারেও তাঁর ডিএনএ পাওয়ার দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া গুলির খোসায় থাকা কিছু চিহ্নের সঙ্গে রবিনসনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা একটি যন্ত্রের মিল রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা ও তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রবিনসনের আইনজীবীরা। তাঁরা দাবি করেছেন, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত প্রমাণে সন্দেহের জায়গা রয়েছে এবং তদন্তের বিভিন্ন ধাপ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মামলায় রবিনসনের রুমমেট ও প্রেমিক ল্যান্স টুইগসের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। আদালতে টুইগসের একটি ভিডিও বক্তব্য দেখানো হয়েছে। তাঁর দাবি, রবিনসন তাঁর কাছে চার্লি কার্ককে গুলি করার কথা স্বীকার করেছিলেন। টুইগসের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কথোপকথনের সময় রবিনসন কেঁদেছিলেন এবং ঘটনাটি যেন না ঘটত, এমন অনুশোচনাও প্রকাশ করেছিলেন।
তবে আদালতে এখন পর্যন্ত উপস্থাপিত এসব বিষয় অভিযোগ ও প্রসিকিউশনের দাবি হিসেবে রয়েছে। রবিনসন নিজে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁর আইনজীবীরাও প্রসিকিউশনের প্রমাণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ফলে মূল বিচার শুরু হলে প্রমাণগুলোর গ্রহণযোগ্যতা, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তৃত আইনি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রসিকিউশন রবিনসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও আদালতে বক্তব্য দিয়েছে। তাদের দাবি, চার্লি কার্কের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি রবিনসনের তীব্র বিরোধিতা ছিল। বিশেষ করে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে কার্কের অবস্থানের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব ছিল বলে প্রসিকিউশন উল্লেখ করেছে। এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মঙ্গলবারের শুনানিতে প্রসিকিউটর চ্যাড গ্রুনান্ডারও মামলাটির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুলি চালানোর সময় আশপাশে বহু মানুষ থাকা সত্ত্বেও রবিনসন হামলা চালিয়েছিলেন, ফলে শুধু কার্ক নয়, অন্য মানুষের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। তিনি মামলার বিচার শুরু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
কার্ক হত্যার পরদিন রবিনসন তাঁর পরিবারের সদস্য ও এক প্রতিবেশীর সঙ্গে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে তিনি কিছু সময় আত্মগোপনে ছিলেন বলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
মামলার শুনানি সরাসরি ক্যামেরায় সম্প্রচার করা হবে কি না, তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। জুলাইয়ের প্রাথমিক শুনানিতে রবিনসনের আইনজীবীরা আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। একই শুনানিতে তদন্তের পদ্ধতি এবং আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া বিশেষজ্ঞদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। মঙ্গলবার বিচারক টনি গ্রাফ দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালতের কার্যক্রম সরাসরি দেখানোর অনুমতি দেন।
চার্লি কার্কের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তাঁর সমর্থকেরা হত্যাকাণ্ডের জন্য দ্রুত ও কঠোর বিচার দাবি করে আসছেন। অন্যদিকে মামলার আসামির পক্ষে আইনজীবীরা ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রমাণের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
এখন পর্যন্ত মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, প্রসিকিউশন যে বিপুল প্রমাণের কথা বলছে, বিচারপর্বে সেগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডিএনএ, ভিডিও ফুটেজ, কথিত স্বীকারোক্তি, অস্ত্র ও অন্যান্য আলামতের পাশাপাশি সাক্ষীদের বক্তব্যও আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামী ২৩ অক্টোবর রবিনসনকে আবার আদালতে হাজির করা হবে। ওই শুনানিতে মামলার মূল বিচার কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করার সুযোগ, আসামির নির্দোষ দাবি এবং প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত প্রমাণ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত এই মামলার পরবর্তী ধাপের দিকে এখন নজর রয়েছে।
কার্কের পরিবারের জন্য এই মামলা শুধু একটি বিচারিক প্রক্রিয়া নয়; এটি প্রিয় একজন মানুষকে হারানোর দীর্ঘ অপেক্ষা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার সঙ্গেও জড়িত। আর রবিনসনের জন্য এটি নিজের বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগের মোকাবিলা এবং আদালতে নিজের নির্দোষ দাবি প্রতিষ্ঠার লড়াই। মূল বিচার শুরু হলে দুই পক্ষের বক্তব্য, প্রমাণ ও সাক্ষ্য কতটা শক্তিশালী, তার ওপরই নির্ধারিত হবে মামলার পরবর্তী গতিপথ।