হিমায়িত খাদ্যে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রপ্তানিমুখী হিমায়িত খাদ্য খাতের উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে গঠিত এই তহবিল থেকে রপ্তানিকারকেরা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এবং সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদে ঋণ সুবিধা পাবেন।

রোববার জারি করা এক সার্কুলারে এ তথ্য জানিয়ে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের জন্য যোগ্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি খাত দীর্ঘ ক্যাশ কনভার্সন সাইকেল, উচ্চ মজুত ব্যয়, কোল্ড-চেইন পরিচালনার বাড়তি খরচ এবং তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে খাতটির উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতেই নতুন এই আর্থিক সহায়তা চালু করা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, সম্পূর্ণ নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ সাত বছর মেয়াদে ঋণ নিতে পারবেন। নতুন কারখানা নির্মাণের জন্য এই তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে বিদ্যমান কারখানার সংস্কার, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত মেয়াদি ঋণ পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ ও উদ্যোক্তার নিজস্ব মূলধনের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭০:৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কাঁচামাল কেনা, কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত চলতি মূলধন ঋণের সুবিধাও রাখা হয়েছে। এ ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। সন্তোষজনক লেনদেনের ভিত্তিতে এটি সর্বোচ্চ একবার নবায়ন করা যাবে, ফলে মোট মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে।

পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্যও অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা রাখা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগ্রহী সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা অথবা মূল প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ—যেটি কম—পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে।

গ্রাহক পর্যায়ে এই তহবিলের ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ। তবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা পাবে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে। এর ফলে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহ করে যোগ্য রপ্তানিকারকদের ঋণ দিতে পারবে।

নতুন তহবিলের আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে চলতি মূলধনের অভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে থাকা হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কার্যকরী মূলধনের অভাবে কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রেখেছে, তাদের পুনরায় উৎপাদনে ফেরাতে এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ঋণখেলাপিরা এই সুবিধা পাবেন না। একইভাবে যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ এবং রপ্তানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল বা ইএফপিএফ থেকে একই খাতের জন্য ঋণ সুবিধা ব্যবহার করছে, তারা নতুন তহবিলের আওতায় একই খাতে ঋণ নেওয়ার যোগ্য হবে না।

তহবিলের ঋণ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও ছাড়পত্র থাকতে হবে। এর মধ্যে মৎস্য অধিদপ্তর এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এ ছাড়া সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিবেশ ও কর্মীদের নিরাপত্তা সম্পর্কিত কিছু বিশেষ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৫ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ নতুন তহবিল শুধু উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর অর্থায়ন হিসেবে নয়, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার একটি নীতিগত উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিশেষ শর্তগুলো যথাযথভাবে পালন না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে এই তহবিলের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য কোনো তহবিল থেকেও ঋণ সুবিধা পাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়বে। ফলে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত পরিবেশ ও শ্রমিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

হিমায়িত খাদ্য বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য হিমায়িত খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে। ফলে এ খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে খাতটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে অর্থ আটকে থাকা। এর সঙ্গে কোল্ড-চেইন অবকাঠামোর ব্যয় এবং সংরক্ষণ ব্যয় যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের প্রয়োজন বাড়ে। কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নতুন তহবিলের মাধ্যমে নতুন কারখানা স্থাপন, পুরোনো কারখানা আধুনিকায়ন এবং চলতি মূলধনের প্রয়োজন—তিন ক্ষেত্রেই অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের শর্ত যুক্ত করায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে নেওয়ার উদ্যোগও এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এ তহবিল থেকে ঋণ বিতরণের জন্য যোগ্য হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বিস্তৃত হতে পারে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত যোগ্যতা, ডাউন পেমেন্ট, অনুমোদন এবং অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।

সার্বিকভাবে, ২ হাজার কোটি টাকার এই প্রাক-অর্থায়ন তহবিল হিমায়িত খাদ্য খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বন্ধ বা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় কার্যক্রমে ফেরানো এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার শর্ত বাস্তবায়ন হলে খাতটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত