প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
একসময় ইউরোপীয় ফুটবলে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন (পিএসজি) নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বিপুল অর্থের বিনিময়ে একের পর এক বিশ্বতারকাকে দলে ভেড়ানোর ছবি। কাতারি মালিকানায় যাওয়ার পর নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি ও জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো তারকাদের ঘিরে গড়ে ওঠা পিএসজির সেই পরিচিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। যে ক্লাবকে একসময় ইউরোপের অন্যতম বড় ‘ক্রেতা’ হিসেবে দেখা হতো, সেই ক্লাবই এখন খেলোয়াড় বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয় করার ক্ষেত্রে ইউরোপের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদল সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ করে ফরাসি উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলাকে লিভারপুলের কাছে বিক্রি এবং তরুণ সেনেগালিজ ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম এমবায়েকে অ্যাস্টন ভিলায় পাঠানোর পর পিএসজির বিক্রয়-আয় নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বারকোলার চুক্তির মোট মূল্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ১৪০ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যেই এটি পিএসজির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় বিক্রির ঘটনা হয়ে উঠেছে।
বারকোলার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ সালে লিওঁ থেকে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ইউরোতে তাকে দলে নিয়েছিল পিএসজি। কয়েক মৌসুমের মধ্যেই সেই খেলোয়াড়কে বহুগুণ বেশি অর্থে বিক্রি করতে পেরেছে তারা। ফলে এটি শুধু একটি ট্রান্সফার নয়, বরং খেলোয়াড়ের মূল্য তৈরি, তার বিকাশ এবং সঠিক সময়ে বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এরপরই অ্যাস্টন ভিলার কাছে ইব্রাহিম এমবায়ের বিক্রি পিএসজির নতুন ব্যবসায়িক মডেলকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ১৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড পিএসজির একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন। অ্যাস্টন ভিলার সঙ্গে তার পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছে এবং ট্রান্সফারটির মূল্য বোনাসসহ প্রায় ৬০ মিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ নিজেদের একাডেমিতে তৈরি করা একজন তরুণ খেলোয়াড়কেও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় অঙ্কের অর্থে বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে প্যারিসের ক্লাবটি।
এখানেই পিএসজির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মূল জায়গাটি ধরা পড়ে। কয়েক বছর আগেও ক্লাবটির দলবদল কৌশলের কেন্দ্রে ছিল বড় তারকা কেনা। বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়দের এনে দলকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছিল পিএসজি। কিন্তু সেই কৌশলের সঙ্গে ছিল বড় বেতন কাঠামো, উচ্চ ট্রান্সফার ব্যয় এবং আর্থিক ভারসাম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে ২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার পর পিএসজির দল গঠনের দর্শনে আরও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। কোচ লুইস এনরিকে এবং ক্লাবের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে ব্যক্তিনির্ভর তারকা-ফুটবলের পরিবর্তে দলগত ভারসাম্য, তরুণ প্রতিভা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এর ফলে পিএসজি শুধু মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দল গড়ার চেষ্টা করেনি, খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ বাজারমূল্য নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের সুফল এখন ট্রান্সফার মার্কেটে স্পষ্ট। বারকোলা, এমবায়ে, গনসালো রামোস, র্যান্ডাল কোলো মুয়ানি, কাং-ইন লি ও অন্য কয়েকজন খেলোয়াড়কে ঘিরে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। ফলে পিএসজির দলবদল আয় দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বারকোলা ও এমবায়ের লেনদেনসহ এবারের গ্রীষ্মে ক্লাবটির বিক্রয় আয় ৩৬০ মিলিয়ন ইউরোর ওপরে উঠে গেছে এবং ইউরোপের শীর্ষ বিক্রেতাদের মধ্যে পিএসজি অবস্থান করছে।
অন্যদিকে, একই দলবদল উইন্ডোতে পিএসজি খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রেও আগের তুলনায় বেশি হিসাবি হয়েছে। তরুণ প্রতিভা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের ওপর বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা এমন একটি স্কোয়াড তৈরির চেষ্টা করছে, যেখানে একজন খেলোয়াড় কেবল মাঠের পারফরম্যান্সের সম্পদ নয়, ভবিষ্যতে ক্লাবের আর্থিক সম্পদও হতে পারেন।
এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘কেনা-বেচার ভারসাম্য’। আগে যেখানে পিএসজির নাম বড় অঙ্কের ব্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত, এখন তারা খেলোয়াড় বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থকে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহে ব্যবহার করছে। ফলে ট্রান্সফার বাজারে তাদের নিট ব্যয় কমছে এবং ক্লাবের আর্থিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
পিএসজির আর্থিক রূপান্তর অবশ্য শুধু খেলোয়াড় বিক্রির ওপর নির্ভর করছে না। ২০১১ সালে কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টস (QSI) ক্লাবটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে পিএসজির ব্যবসায়িক পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ক্লাবের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ সালে প্রায় ৯৯ মিলিয়ন ইউরোর রাজস্ব থেকে ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা বেড়ে ৮৩৭ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক যুগের কিছু বেশি সময়ে রাজস্ব প্রায় নয় গুণ হয়েছে।
ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগেও পিএসজির আর্থিক শক্তির প্রতিফলন দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমের ৮৩৭ মিলিয়ন ইউরো রাজস্ব নিয়ে পিএসজি ইউরোপের চতুর্থ সর্বোচ্চ আয়কারী ক্লাব ছিল। তাদের সামনে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও বায়ার্ন মিউনিখ। লিভারপুলও খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিল।
তবে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, মাঠের সাফল্যও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিএসজি ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রথমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে। একই মৌসুমে ফরাসি লিগ, ফরাসি কাপ ও অন্যান্য শিরোপাও ঘরে তোলে তারা। অর্থাৎ ক্লাবটি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে খেলোয়াড় বিক্রি করে অর্থ আয় এবং মাঠে শিরোপা জয়—দুই লক্ষ্যকে একই কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ফুটবল অর্থনীতিতে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য তাই বেশ গভীর। একটি ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ খরচ করে তারকা কিনতে পারে, কিন্তু সেই বিনিয়োগকে টেকসই ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করা অনেক কঠিন। পিএসজি এখন সেই কঠিন কাজটিই করার চেষ্টা করছে। একাডেমি থেকে প্রতিভা তুলে আনা, তরুণ খেলোয়াড়দের বিকাশ ঘটানো, তাদের বাজারমূল্য বাড়ানো এবং সঠিক সময়ে বিক্রি করা—এই চক্রটি সফল হলে ক্লাবের ট্রান্সফার আয় ভবিষ্যতেও বড় হতে পারে।
তবে এর সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। বড় অর্থে খেলোয়াড় বিক্রি করার পর সমমানের বিকল্প তৈরি করতে না পারলে মাঠের শক্তি কমে যেতে পারে। আবার তরুণ খেলোয়াড়দের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দলকে অভিজ্ঞতার সংকটে ফেলতে পারে। তাই পিএসজির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সাফল্য এবং ক্রীড়া সাফল্যের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখা।
তারপরও সাম্প্রতিক দলবদলের চিত্র একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—পিএসজি আর শুধু অর্থ খরচ করা ক্লাব নয়। একসময় যারা ইউরোপের বাজারে সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের একজন ছিল, তারা এখন নিজেরাই বাজারে খেলোয়াড়ের মূল্য তৈরি করে বড় অঙ্কে বিক্রি করছে। বারকোলা ও এমবায়ের মতো লেনদেন সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ।
ফুটবলের অর্থনীতি যখন ক্রমেই ব্যবসা, ব্র্যান্ড, খেলোয়াড়ের বাজারমূল্য এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন পিএসজির এই রূপান্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারকার ঝলক থেকে ব্যবসায়িক দক্ষতার দিকে যাত্রা—প্যারিসের ক্লাবটির সাম্প্রতিক গল্প হয়তো ইউরোপীয় ফুটবলের পরিবর্তিত অর্থনীতিরই একটি প্রতিচ্ছবি।