বড় ঋণখেলাপিদের ১৫ বছর মেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ বার

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকা খেলাপি গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদি পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতারা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডও পাবেন। ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রম পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিশেষ নীতি সহায়তার মেয়াদও আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে তা পরিপালনের নির্দেশ দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে অশ্রেণিকৃত বা খেলাপিমুক্ত অবস্থায় থাকবেন, তারা বিশেষ পুনর্গঠন সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন। অন্যদিকে যেসব ঋণ সাব-স্ট্যান্ডার্ড (এসএস), ডাউটফুল (ডিএফ) এবং ব্যাড/লস (বিএল) পর্যায়ে রয়েছে, সেসব গ্রাহক পুনঃতফসিল সুবিধা পাওয়ার জন্য বিবেচিত হবেন।

তবে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনে ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধার আওতায় আবেদন করার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ জুন। একই সঙ্গে তখন সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ ছিল। নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে বিশেষ নীতি সহায়তার সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য পুনঃতফসিলের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।

নতুন নীতিতে এক হাজার কোটি টাকার কম ঋণ থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে আগের মতোই দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার নিচে হলে নতুন করে ১৫ বছর মেয়াদি সুবিধা প্রযোজ্য হবে না।

অন্যদিকে একক প্রতিষ্ঠান কিংবা গ্রুপ হিসেবে এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ ১৫ বছর মেয়াদি পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা পেতে পারবে। তাদের জন্য দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে বিশেষ নীতি সহায়তার আওতায় সুবিধা পেয়েছে, তারাও নতুন করে এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ আগেও কোনো প্রতিষ্ঠান ১০ বছর বা ১২ বছর মেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা নিয়ে থাকলে, নতুন আবেদনের মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সেই মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

এতে বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধের সময়সীমা আরও দীর্ঘ হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনর্গঠন করে আয় ও নগদ প্রবাহ স্বাভাবিক করার মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করাই এ নীতি সহায়তার অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংকটে পড়ায় তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণের কিস্তি ও পরিশোধের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হলে ঋণগ্রহীতাদের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ পরিকল্পনা ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এ ধরনের সুবিধার কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সক্ষম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যথাযথ পার্থক্য করার ওপর।

নতুন নির্দেশনায় আবেদন ও নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের ঋণের অবস্থান এবং সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন যাচাই ও পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর তাৎক্ষণিক ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে পারে। তবে এর ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায়ের সময়সীমা দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনও বাড়বে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য আগের তুলনায় দীর্ঘ সময়ের আর্থিক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন করে সুবিধা নিতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হবে শর্ত পূরণকারী গ্রাহকদের আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

সার্বিকভাবে, নতুন নীতি সহায়তার লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া এবং তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। তবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুনঃতফসিল সুবিধার যথাযথ ব্যবহার এবং নিয়মিত তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত