প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনে একটি সুপারশপে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় বাংলাদেশির মৃত্যুর এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্বজনহারাদের শোক কমার বদলে যেন আরও গভীর হয়েছে। প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ না পাওয়া, দেশে লাশ ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং বিদেশের মাটিতেই দাফনের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে নিহতদের পরিবারগুলো এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
মর্মান্তিক ওই ঘটনায় নিহত ছয় বাংলাদেশির মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কেউ বাড়ি নির্মাণ করছিলেন, কেউ বোনের বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন, কেউ দেশে ফিরে সংসার শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু গত ২৮ জুলাই রাতের সেই ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই সব স্বপ্ন থামিয়ে দেয়।
শুধু স্বজন হারানোর বেদনাই নয়, নিহতদের পরিবারগুলোর সামনে এখন নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে অর্থকষ্ট। পরিবারের অভিযোগ, নিহতদের কয়েকজন দীর্ঘদিন দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজ করলেও তাদের বেতনের একটি বড় অংশ বকেয়া ছিল। মৃত্যুর পরও সেই পাওনা পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয়ভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি তারা।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও বিপুল ব্যয়ের কারণে নিহতদের মরদেহ বাংলাদেশে আনা সম্ভব হয়নি। পরিবারের সম্মতিতে দক্ষিণ আফ্রিকাতেই তাদের দাফন করা হয়। ফলে প্রবাসে থাকা সন্তান, ভাই কিংবা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগও পাননি স্বজনরা।
একটি পরিবারের জন্য প্রিয়জনের মৃত্যুর সংবাদই যেখানে অসহনীয়, সেখানে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ না পাওয়ার বেদনা আরও গভীর। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ফোনে কিংবা পরিচিতজনদের কাছ থেকে তারা শুধু মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। কিন্তু শেষবারের মতো মুখ দেখার সুযোগটুকুও তাদের ভাগ্যে জোটেনি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের একজন ছিলেন নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী ইউনিয়নের রামনগর পশ্চিম এলাকার বাসিন্দা শাহীন। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়ে দাদির কাছে বড় হন তিনি। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় অল্প বয়স থেকেই সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে।
অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই জীবনের পথ চলা শুরু হয়েছিল শাহীনের। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় ২০১৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। স্বজনদের আশা ছিল, কয়েক বছর পর দেশে ফিরে তিনি নিজের জীবনের পাশাপাশি পরিবারের ভবিষ্যৎও নতুনভাবে গড়ে তুলবেন।
কিন্তু দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পরও পরিবারের আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, যে দিন অগ্নিকাণ্ডে শাহীন মারা যান, সেদিনই তার বৈধ কাগজপত্র হাতে আসে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু ঘরে ফেরার স্বপ্ন পূরণের আগেই আগুনে পুড়ে তার জীবন থেমে যায়।
শাহীনের ছোট ভাই শাওনের অভিযোগ, দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি সুপারশপে কাজ করতেন শাহীন এবং দীর্ঘদিনের চাকরির প্রায় ১৪ লাখ টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে। পরিবারের দাবি, শাহীনের মৃত্যুর পরও সেই অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তারা এ পাওনা যাচাই করে দ্রুত পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন।
তবে বকেয়া বেতন ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
একই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের বাসিন্দা আপন। তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের জন্য অনেক স্বপ্ন। একমাত্র বোনের বিয়ে এবং পরিবারের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। কাজ শুরু হলেও বাড়িটি পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। আজ সেই অর্ধনির্মিত বাড়িই যেন পরিবারের অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
২০২১ সালে পাঁচ বছরের চুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন আপন। পরিবারের সদস্যরা জানান, আর মাত্র দুই মাস পর দেশে ফেরার কথা ছিল তার। প্রবাসের কষ্টের দিন শেষ করে পরিবারের কাছে ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্তু দেশে ফেরার পরিবর্তে আসে তার মৃত্যুর খবর।
আপনের বাবা-মা এখন একদিকে ছেলের শোকে ভেঙে পড়েছেন, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও অসমাপ্ত বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। যে ছেলে বিদেশে গিয়েছিল সংসারের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য, তার মৃত্যুর পর সেই পরিবার এখন আরও কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মুখোমুখি।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরেকজন ছিলেন একই এলাকার মনির সরকারের ছেলে ফাহিম। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই জীবিকার সন্ধানে ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান ফাহিম।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার কথা ছিল তার। পরিবারও সেই অপেক্ষায় ছিল। দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরু করবেন, বিয়ে করবেন—এমন পরিকল্পনাও ছিল পরিবারের।
স্বজনরা জানান, ছোট দুই ভাইয়ের জন্য একটি মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন ফাহিম। দেশে ফিরে সেই মোটরসাইকেল চালানোর ইচ্ছা ছিল তার। পরিবারের সদস্যরাও ভেবেছিলেন, বহু বছর বিদেশে কাটানোর পর এবার তাকে ঘিরে নতুন আনন্দের আয়োজন হবে।
কিন্তু আগুনে পুড়ে ফাহিমের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সেই স্বপ্নও ভেঙে যায়। এখন তার পরিবার শুধু একজন উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর শোকই বহন করছে না, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাও তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
স্বজনদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহল থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই যোগাযোগ কমে গেছে। তারা বলছেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা কিংবা ক্ষতিপূরণ পাননি।
নিহতদের পরিবারের আরও অভিযোগ, কয়েকজনকে অবৈধ পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে তারা কাজ করলেও যথাযথভাবে তাদের শ্রমের মূল্য দেওয়া হয়নি। কারও কারও কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে বলেও দাবি পরিবারের সদস্যদের।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের বেতন, নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও বিষয়গুলো যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়েজ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রশাসন নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, সরকারি আর্থিক অনুদান পাওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
তিনি আরও জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার যে প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেখানে নিহতদের কোনো বেতন বা অন্য পাওনা থাকলে তা আদায়ের বিষয়েও চেষ্টা করা হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিবারের অভিযোগগুলো যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত ২৮ জুলাই রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনের একটি সুপারশপে আগুন লাগে। ওই সময় দোকানের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা ছয় বাংলাদেশি আগুনে পুড়ে মারা যান। নিহতদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ইউনিয়নের ফাহিম, আপন ও নুর মোহাম্মদ, বক্তাবলী ইউনিয়নের ফয়সাল ও শাহীন এবং মুন্সীগঞ্জের রাজিক ছিলেন।
প্রবাসে থাকা এসব মানুষের প্রত্যেকের জীবনেই ছিল একটি সাধারণ স্বপ্ন—পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করা এবং একদিন দেশে ফিরে প্রিয়জনদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা। কেউ সেই স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, কেউ দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন ঘরে ফেরার।
কিন্তু কুইন্স টাউনের সেই আগুন তাদের জীবনের সব হিসাব বদলে দিয়েছে। এখন স্বজনদের চোখে শুধু শোক নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে।
নিহতদের পরিবারগুলোর দাবি, তাদের প্রিয়জনদের বকেয়া বেতন বা অন্য কোনো পাওনা থাকলে তা দ্রুত যাচাই করে পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
একটি অগ্নিকাণ্ড ছয়টি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ছয়টি পরিবারের বহু মানুষের জীবনে। উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে বসে আছেন, কেউ অসমাপ্ত বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে যার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন, তিনি আর কোনো দিন ফিরবেন না।
স্বজনদের প্রত্যাশা, শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়ানো হবে এবং তাদের আর্থিক সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন নিহতদের স্বজনদের।