সিটিজেন চার্টার নেই, সেবা পেতে ভোগান্তিতে ময়মনসিংহবাসী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
সিটিজেন চার্টার নেই, সেবা পেতে ভোগান্তিতে ময়মনসিংহবাসী

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি দপ্তরে গিয়ে একটি সেবা পেতে কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন, কত টাকা ফি দিতে হবে কিংবা কতদিনের মধ্যে সেবা পাওয়া যাবে—এমন মৌলিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে প্রতিটি নাগরিকের। এই তথ্যগুলো সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার বা নাগরিক সেবা প্রতিশ্রুতি দৃশ্যমান স্থানে রাখার কথা। কিন্তু ময়মনসিংহের অনেক সরকারি দপ্তরে সেই সিটিজেন চার্টারের অস্তিত্বই নেই। কোথাও থাকলেও তা নাগরিকের চোখে পড়ার মতো স্থানে নেই, আবার কিছু ক্ষেত্রে তথ্য পুরোনো ও অসম্পূর্ণ।

এ পরিস্থিতিতে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেককে এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার কাছে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও কোথায় যোগাযোগ করতে হবে তা না জানায় সাধারণ মানুষ কর্মচারী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা দালালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। সচেতন নাগরিকদের আশঙ্কা, তথ্যের এই ঘাটতি সরকারি সেবায় হয়রানি ও অনিয়মের সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে।

ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, সড়ক বিভাগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস এবং হাসপাতালসহ অন্তত ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব অফিসের মধ্যে মাত্র কয়েকটিতে সিটিজেন চার্টার পাওয়া গেছে।

যেসব দপ্তরে সিটিজেন চার্টার রয়েছে, সেখানেও সব ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও চার্টার এমন জায়গায় রাখা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের চোখে পড়ার সম্ভাবনা কম। আবার কোনো কোনো চার্টার দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ না হওয়ায় সেখানে থাকা তথ্যের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সিটিজেন চার্টার মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের মধ্যে সেবা প্রদানের একটি প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক জানতে পারেন, তিনি কোন সেবা পাবেন, সেই সেবা পেতে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, কত টাকা খরচ হবে এবং কত সময়ের মধ্যে সেবা পাওয়ার কথা।

এ ছাড়া কোনো নাগরিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না পেলে বা সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে কোথায় অভিযোগ করবেন, সে সম্পর্কেও তথ্য থাকার কথা। ফলে একটি কার্যকর ও হালনাগাদ সিটিজেন চার্টার সরকারি সেবাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকবান্ধব করে তুলতে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি বা সিটিজেন চার্টার প্রণয়নসংক্রান্ত নির্দেশিকায় সরকারি দপ্তরগুলোর জন্য নাগরিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অভ্যন্তরীণ—বিভিন্ন ধরনের সেবার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি সেবার নাম, সেবা প্রদানের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ফি, পরিশোধের নিয়ম, সেবা পাওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচয় উল্লেখ থাকার কথা।

কিন্তু ময়মনসিংহের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এসব মৌলিক তথ্যের ঘাটতি দেখা গেছে। কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম বা পদবি নেই, কোথাও ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে একজন নাগরিক কোনো সমস্যায় পড়লে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, তা বুঝতে না পেরে বাড়তি ভোগান্তির শিকার হতে পারেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত একটি সেবা নিতে আসা ফেরদৌসি বেগম জানান, প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকে জানা না থাকায় তাকে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে যেতে হয়েছে। কোথায় আবেদন করতে হবে, কী কাগজপত্র প্রয়োজন কিংবা সেবার জন্য কী পরিমাণ অর্থ লাগবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তার মতো অনেক সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা হলো, সরকারি সেবার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগে থেকে পরিষ্কার তথ্য থাকলে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরি ও সময় নষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটি দৃশ্যমান সিটিজেন চার্টার থাকলে মানুষ অফিসে যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন।

ময়মনসিংহ নগরীর সিনিয়র সিটিজেন সালিম হাসানের মতে, সরকারি সেবার নিয়মকানুন সম্পর্কে জনগণকে অন্ধকারে রাখা হলে দালালনির্ভরতা বাড়তে পারে। নাগরিক যদি না জানেন তাঁর কাজের সরকারি ফি কত, কতদিনে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা কিংবা কোন কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাহলে সহজেই বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

সচেতন নাগরিকদের মতে, সিটিজেন চার্টারের অনুপস্থিতি শুধু একটি প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকেও প্রভাবিত করে। সরকারি অফিসে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ্যে না থাকলে সাধারণ মানুষ ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েন। আর এই ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগে কোথাও কোথাও হয়রানি, অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

অনুসন্ধানে ময়মনসিংহ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয়ে সিটিজেন চার্টার সম্পর্কে জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। একইভাবে ময়মনসিংহের সড়ক ভবন ও গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়েও দৃশ্যমান কোনো সিটিজেন চার্টার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ময়মনসিংহ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, তাদের ভবনে কোনো সিটিজেন চার্টার নেই। তথ্যের প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সিটিজেন চার্টারের মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তিনির্ভরতা কমিয়ে তথ্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা।

অর্থাৎ, একজন নাগরিককে কোনো তথ্যের জন্য বারবার একজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির দ্বারস্থ হতে হবে না। বরং প্রয়োজনীয় তথ্য এমনভাবে প্রকাশ্যে থাকবে, যাতে যে কেউ সহজেই তা জানতে পারেন।

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কেও সিটিজেন চার্টার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে কর্মরত একজন কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ সরাসরি এসে প্রয়োজনীয় কাজের বিষয়ে তথ্য নেন এবং কর্মচারীরা তাদের সহায়তা করেন। তবে নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, ব্যক্তিগত সহায়তা সিটিজেন চার্টারের বিকল্প হতে পারে না।

অন্যদিকে, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কেও নাগরিক সেবা প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের সেবা গ্রহণের পদ্ধতি এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিটিজেন চার্টারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা। কোনো নাগরিক কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেলে বা সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে সমাধান না হলে অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা এবং পরবর্তী পর্যায়ে আপিল কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

কিন্তু এসব তথ্য নাগরিকের সামনে দৃশ্যমান না থাকলে অধিকাংশ মানুষ জানতেই পারেন না যে, সরকারি সেবা না পাওয়ার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ জানানোর অধিকার রয়েছে। ফলে অধিকার থাকা সত্ত্বেও অনেক নাগরিক তা প্রয়োগ করতে পারেন না।

সুশাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু সিটিজেন চার্টার তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। এটি নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে এবং এমন স্থানে প্রদর্শন করতে হবে, যেখানে অফিসে আসা সাধারণ মানুষ সহজেই দেখতে পারেন। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

সচেতন নাগরিক কমিটি, ময়মনসিংহের সভাপতি শরীফুজ্জামান পরাগ মনে করেন, সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের পাশাপাশি নিয়মিত হালনাগাদ করা জরুরি। শুধু কাগজে বা ফাইলে একটি চার্টার থাকলে নাগরিকরা কোনো সুবিধা পাবেন না। সেখানে উল্লেখিত সেবা, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেছেন, সিটিজেন চার্টার নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সেবা প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি সরকারি কার্যালয়ে এটি থাকার কথা। যেসব দপ্তরে সিটিজেন চার্টার নেই, সেগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

সরকারি সেবা মানুষের অধিকার এবং সেই সেবা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাওয়াও নাগরিকের ন্যায্য দাবি। তাই ময়মনসিংহের সরকারি দপ্তরগুলোতে সিটিজেন চার্টারের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও বাড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি দপ্তরে হালনাগাদ সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান স্থানে রাখা এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ সরকারি সেবার দরজায় এসে কোনো নাগরিক যেন তথ্যের অভাবে বিভ্রান্ত না হন কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কারও ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন, সেটিই হওয়া উচিত একটি কার্যকর জনসেবামুখী প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত