প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বাড়াতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ কর্মসূচি চালু করেছে। এ উদ্যোগে নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য জমা দিলে তার বিনিময়ে চাল, ডাল, তেল, লবণ, আলু, টিস্যুসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের হাজারীবাগ বস্তি সংলগ্ন মাঠে কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। উদ্বোধনের পর স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জমা দিয়ে অস্থায়ী স্টল থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করেন।
কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। ‘বর্জ্যের বিনিময়ে বাজার’ নাগরিকদের সেই অংশগ্রহণে উৎসাহিত করার একটি কার্যকর মডেল হতে পারে।
তিনি বলেন, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ড্রেন, নালা ও নর্দমায় ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য জমা দিলে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়তা করবে, অন্যদিকে পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
কর্মসূচিটি ধীরে ধীরে নগরজুড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান আবদুস সালাম। তিনি বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে গুলিস্তানে একটি স্থায়ী স্টল নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে ডিএসসিসির প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্থায়ী স্টল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্থায়ী স্টলের মাধ্যমে নগরবাসীকে বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা দেওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা হবে। এর ফলে সড়ক, ফুটপাত, ড্রেন ও নালা-নর্দমায় যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগও বাড়বে।
এ ছাড়া সুবিধাজনক অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের (এসটিএস) কাছে পথশিশুদের জন্য চেয়ার-টেবিল ও বইসহ ‘বই পড়ার বিনিময়ে খাবার’ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, তাঁদের লক্ষ্য শুধু প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা দেওয়া নয়, বরং তাদের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অংশীদার করা। বর্জ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নাগরিকদের সঙ্গে সামাজিক সহায়তার একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তিনি জানান, গত দুই বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য বিক্রি করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন প্রায় ১ কোটি টাকা আয় করেছে। ওই অর্থ ব্যবহার করে প্রায় ৪ লাখ মানুষকে আহার করানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
ডিএসসিসি ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগের আওতায় আগামী এক বছরে ১০০টি ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইন পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ কেজি বর্জ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বর্জ্যকে শুধু পরিত্যক্ত বস্তু হিসেবে না দেখে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করা গেলে তা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার করা সম্ভব। এতে একদিকে নগরের বর্জ্যের চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
নগর ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাসাবাড়ি, বাজার ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়। এসব বর্জ্যের একটি অংশ নির্ধারিত স্থানে না গিয়ে সড়ক, খোলা জায়গা কিংবা ড্রেন ও নর্দমায় জমা হয়। বর্ষাকালে এই বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নাগরিকদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্জ্যের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ থাকায় নিম্নআয়ের মানুষও কর্মসূচিতে আগ্রহী হতে পারেন। একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত সুফল পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে নিয়মিত সংগ্রহ, বর্জ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস, পর্যাপ্ত স্টল ও সংগ্রহকেন্দ্র এবং সংগৃহীত বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর। নগরবাসীর অংশগ্রহণের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক সমন্বয়ও এ উদ্যোগের কার্যকারিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিনসহ সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকেরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এ কর্মসূচির মাধ্যমে নগরবাসীকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও জনসম্পৃক্ত ও কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী এক বছরে ১০০টি ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইন এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থায়ী স্টল চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য সংগ্রহের পরিধি আরও বাড়বে বলে আশা করছে আয়োজকরা।