প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটিগুলোতে যানজট, গণপরিবহণের অদক্ষতা, যাত্রীচাপ ও রুট ব্যবস্থাপনার মতো জটিল সমস্যা সমাধানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন চীনের থোংচি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ট্রান্সপোর্টেশনের সহযোগী অধ্যাপক ড. লি চিয়ান। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের স্মার্ট নগর পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এআই গুরুত্বপূর্ণ দিশারি হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে আয়োজিত পৃথক দুটি সেমিনারে নগর পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা তুলে ধরেন ড. লি চিয়ান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নগর পরিবহণ ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ ভাষা মডেলের ব্যবহার’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ ফারুক কনফারেন্স হলে আয়োজন করা হয় আরেকটি বিশেষ সেমিনার।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এহসান আহমেদ আশরাফি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে বক্তব্য দেন ড. লি চিয়ান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল হক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সেমিনারে ড. লি চিয়ান ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে সাধারণ এআই মডেলকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার ও কার্যকর মডেলে রূপান্তর করা যায়। বিশেষ করে নগর পরিবহণে এআই প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি চারটি প্রধান স্তরের কথা তুলে ধরেন।
এই চার স্তরের মধ্যে রয়েছে ডেটা এনহ্যান্সমেন্ট, নলেজ গ্রাফভিত্তিক নলেজ এনহ্যান্সমেন্ট, অ্যালগরিদমিক মডেল এনহ্যান্সমেন্ট এবং মাল্টি-এজেন্ট সহযোগিতার মাধ্যমে টাস্ক এনহ্যান্সমেন্ট। এসব প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও ব্যবহারবান্ধব করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ড. লি চিয়ান চীনের শাংহাইয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের উদাহরণও তুলে ধরেন। এসব উদাহরণের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের অভিযোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত বাস রুট সংস্কার এবং ‘শাংহাই পাবলিক ট্রানজিট নলেজ গ্রাফ’ ব্যবহার করে পরিবহণ নীতিমালা সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক শুল্ক ও এইচএস কোড শ্রেণীকরণ এবং ডোর-টু-ডোর স্মার্ট রুট পরিকল্পনায় এআই ব্যবহারের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। যাত্রীদের চলাচলকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করতে স্বল্প-কার্বন যাতায়াত পরিকল্পনায় এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
বাস রুট পরিবর্তনের পর যাত্রীদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া আগেই বিশ্লেষণ ও সিমুলেশনের মাধ্যমে বোঝার ক্ষেত্রেও এআই কার্যকর হতে পারে বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়। এতে কোনো রুট পরিবর্তনের আগে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।
ড. লি চিয়ান বলেন, শুধু তাত্ত্বিক মডেল তৈরি করলেই স্মার্ট পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় একটি শক্তিশালী ওপেন-সোর্স স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব।
নগরায়ণের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বড় শহরগুলোতে পরিবহণ ব্যবস্থাপনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। বিপুল পরিমাণ যাত্রী ও যানবাহনের তথ্য বিশ্লেষণ, চাহিদা পূর্বাভাস, রুট পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে নগর পরিবহণ আরও সমন্বিত ও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ণশীল দেশেও এ ধরনের প্রযুক্তির প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে গণপরিবহণের রুট ব্যবস্থাপনা, যানজট বিশ্লেষণ, যাত্রীচাহিদা পূর্বাভাস এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত পরিকল্পনায় এআইভিত্তিক ব্যবস্থা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর করতে নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত ডেটা, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। ডেটার মান ও ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে উন্নত এআই মডেলও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।
সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণা ও অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, নগর পরিবহণের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় এআই শুধু সহায়ক প্রযুক্তি নয়; বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তিকে বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।