বাজার নিয়ন্ত্রণের বিরোধে ফরিদপুরে সংঘর্ষ, আহত ৩০

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
বাজার নিয়ন্ত্রণের বিরোধে ফরিদপুরে সংঘর্ষ, আহত ৩০

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে সীমান্তবর্তী একটি বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। কয়েক দফায় হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং হামলার ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হয়েছে।

ঘটনাটি বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী ময়েনদিয়া বাজারকে ঘিরে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারটির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শনিবার বাজার এলাকায় হামলার ঘটনার পর রোববার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৪টার দিকে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় প্রথমে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে তা সংঘর্ষে গড়ায়। বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত কয়েকজনের অবস্থার অবনতি হলে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গুরুতর আহতদের মধ্যে রয়েছেন পরমেশ্বরদী এলাকার কবির মোল্যা, কামরুল মোল্যা ও লোকমান মোল্যা। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইজাজ আহমেদ শাওন জানান, রোববার সন্ধ্যার পর একাধিক ব্যক্তি আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। তাদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের আঘাত গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ময়েনদিয়া বাজারটি বোয়ালমারীর পরমেশ্বরদী ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। বাজারকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরে চললেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয় বলে স্থানীয়দের দাবি।

এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের বরখাস্তকৃত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বর এবং সালথা উপজেলার খাড়দিয়া এলাকার বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের সমর্থকদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বিভক্তি রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর কিছু মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যান এবং বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুরোনো বিরোধ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

গত কয়েক দিনে একাধিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে হামলার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের একাংশ অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষের কয়েকজন সমর্থক ওই হামলায় জড়িত ছিলেন। তবে এ অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে।

পরদিন শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে গিয়ে এক যুবদল নেতার সঙ্গে স্থানীয়দের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। এ সময় এক ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীর কাছে চার হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জড়ো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে একজন আহত হন।

খবর পেয়ে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেন বলে তার পক্ষের দাবি। এরপর একটি ফার্মেসিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার সময় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই হামলায় তিনিও আহত হন বলে তার দাবি।

জিহাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের লোকজন পরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে, বাজারে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের লোকজনই আগে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, দোকানদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হতো এবং কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি ও মারধরের ঘটনা ঘটত। শনিবারের ঘটনার সময়ও এক ব্যবসায়ীর কাছে চার হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

শনিবারের হামলার ঘটনার জের ধরেই রোববারের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে স্থানীয়দের ধারণা। ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুই পক্ষের বিপুলসংখ্যক লোকজন জড়ো হওয়ার পর প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি করেন এবং আশপাশের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সালথার খাড়দিয়া এলাকার কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি পক্ষের সঙ্গে ময়েনদিয়া এলাকার অপর পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ দীর্ঘ সময় চলায় এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে।

সংঘর্ষের পর ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাজারে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর দুইজনকে আটক করা হয়েছে। পরবর্তীতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নতুন করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এই বিরোধ দ্রুত নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কারণ একটি বাজারকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের লড়াই বারবার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। আহতদের চিকিৎসা, হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন সংঘর্ষ প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত