সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ হওয়ার শঙ্কা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ হওয়ার শঙ্কা

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। আগস্টে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা জুলাইয়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। মাসের শেষ দিকে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরেই চলতি বছরের ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১৬৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে।

আগস্ট মাসজুড়েই ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, শুধু আগস্টেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী। জুলাই মাসে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯ হাজার ২০০-এর কিছু বেশি। ফলে এক মাসের ব্যবধানে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে মোট ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ২০৫ জন চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে নতুন রোগী ভর্তির গতি বাড়তে থাকায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে। সাধারণত বর্ষাকালে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়লেও শুধু মৌসুমি বৃষ্টির ওপর পরিস্থিতি নির্ভর করে না। নগর ও গ্রামীণ এলাকায় জমে থাকা পরিষ্কার পানির ছোট ছোট উৎসও এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি মাসেই বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের আরও কিছু সময় লাগতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই এবার ডেঙ্গুর বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বান্দরবান, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও খুলনাসহ কয়েকটি এলাকায় সংক্রমণের মাত্রা বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে ডেঙ্গুকে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় সর্বত্রই এখন এ রোগের ঝুঁকি রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৮২ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২৩ জন এবং দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ১৫৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে খুলনা বিভাগে নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় ২৮৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল বিভাগে ১৩২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬৯ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৮৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। রংপুর বিভাগে সাতজন এবং সিলেট বিভাগে একজন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

এই চিত্র থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, ডেঙ্গুর চাপ এখন আর কেবল রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকেও বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল, সেসব এলাকাতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সব এলাকায় সমন্বিতভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রামেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ৫০ শয্যার ওয়ার্ড চালু করা হলেও সেখানে অনেক সময় নির্ধারিত শয্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এতে চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতালের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা পরবর্তীতে অন্য ব্যক্তিকে কামড়ানোর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। এ কারণে আক্রান্ত রোগীরাও মশারি ব্যবহার করলে সংক্রমণের বিস্তার কমাতে সহায়ক হতে পারে।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপ আরও বাড়লে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগস্ট মাসের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে। চলতি বছরের মোট ৯৭ জন মৃত্যুর মধ্যে আগস্টেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, গুরুতর রোগীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার বিষয়টিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকেই প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর হিসেবে বিবেচনা করেন। এতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি হতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ ও শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। জ্বরের সঙ্গে শরীরে দুর্বলতা, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক রক্তপাত, অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব বা অস্থিরতার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাড়ি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের এলাকায় কোথাও পরিষ্কার পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদের বিভিন্ন অংশ এবং নির্মাণকাজের আশপাশে জমে থাকা পানিও এডিস মশার প্রজননের স্থান হতে পারে। তাই ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও ডেঙ্গুকে একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের ভূমিকা যথেষ্ট নয়। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, আগস্টে সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরেও তা অব্যাহত থাকতে পারে। বর্ষার প্রভাব, মশার বংশবিস্তার এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাড়ি বা একটি এলাকার জমে থাকা পানি পুরো আশপাশের মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে সম্মিলিত জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে আগস্টে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি এবং বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা সত্যি হলে চলতি মাসে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্ত, সময়মতো চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ এখনই জোরদার করা জরুরি।

আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা সচেতনভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন তার ওপর। সেপ্টেম্বরকে সামনে রেখে তাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বার্তা একটাই—সতর্কতা ও প্রতিরোধে এখন কোনো শৈথিল্যের সুযোগ নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত