মেধা ও নৈতিকতায় কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার আহ্বান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
মেধা ও নৈতিকতায় কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার আহ্বান

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মেধা, দক্ষতা, সততা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত, ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা। তাদের মতে, শুধু ভালো ফলাফল কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনই একজন তরুণকে প্রকৃত নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট করে তোলে না; এর সঙ্গে প্রয়োজন দৃঢ় নৈতিকতা, সঠিক চরিত্র, মানবিক মূল্যবোধ এবং দেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা।

চলতি বছরের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের জনশক্তিদের নিয়ে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী ‘প্রি-কলেজ স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং ক্যাম্প (পিসিএসডি) ২০২৬’-এর বিভিন্ন সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। গত ২১ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুরের একটি মিলনায়তনে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ বিভাগের উদ্যোগে এ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পটি পরিচালনা করেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ‘সততা ও দূরদর্শিতায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা’। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কলেজ জীবনের নতুন ও বিস্তৃত শিক্ষাঙ্গনে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানসিক, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়।

এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার পর একজন শিক্ষার্থীর জীবনে কলেজ পর্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। নতুন পরিবেশ, নতুন প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য প্রস্তুতির এই পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে। আয়োজকদের মতে, শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে বর্তমান সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

ক্যাম্পে প্রতিদিন ইংরেজি ও কম্পিউটার বিষয়ে মোট ৪০টি ক্লাস আয়োজন করা হয় বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, বিষয়ভিত্তিক স্টাডি সেশন, মোটিভেশনাল ক্লাস এবং বিভিন্ন উদ্ভাবনী খেলাধুলা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের বিভিন্ন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের ওপরও জোর দেওয়া হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানসহ ক্যাম্পের বিভিন্ন সেশনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। বক্তারা আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তরুণদের সামনে থাকা সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন।

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি তার বক্তব্যে আত্মশুদ্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং একাডেমিক যোগ্যতা অর্জন জরুরি হলেও মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র ও নৈতিক ভিত্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তার বক্তব্যে একজন ভবিষ্যৎ নেতার ব্যক্তিগত গুণাবলি প্রসঙ্গে বলা হয়, সঠিক চরিত্র ও সঠিক দিকনির্দেশনার সমন্বয় ছাড়া টেকসই ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে ওঠা কঠিন। ব্যক্তিগত জীবনে সততা, আত্মসংযম ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, জিপিএ-৫ অর্জন শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও এটিকে চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং এই অর্জনকে ভবিষ্যতের আরও বড় দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, জ্ঞান, দক্ষতা এবং নৈতিক দৃঢ়তার সমন্বয় ঘটিয়ে তরুণদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সৎ, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি তরুণদের সেই দায়িত্ব গ্রহণের উপযোগী হয়ে ওঠার আহ্বান জানান।

বক্তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনার বিষয়টি। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারলে জাতীয় উন্নয়ন আরও গতিশীল হতে পারে বলে তারা মত প্রকাশ করেন।

ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসাইন বলেন, বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় একটি দেশ এবং দেশের মানবসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব। তার বক্তব্যে তরুণদের জ্ঞান ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের বিস্তারের ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে প্রতিযোগিতা। এ বাস্তবতায় তরুণদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই চলবে না, বরং ভাষা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং সমস্যা সমাধানের মতো বাস্তবমুখী দক্ষতাও অর্জন করতে হবে।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজনকে এই বাস্তবতার সঙ্গে তরুণদের পরিচিত ও প্রস্তুত করার একটি উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন আয়োজকরা। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন সেশনে সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম, রাশেদুল ইসলাম এমপি, জাহিদুল ইসলাম এবং ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাসহ অন্যান্য নেতারা বক্তব্য দেন।

বক্তারা তরুণদের নিজেদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডির বাইরে গিয়ে দেশ ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভাবার আহ্বান জানান। তাদের বক্তব্যে বলা হয়, শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠার পাশাপাশি যদি সেই শক্তির মধ্যে সততা ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে দুর্নীতি, বৈষম্য এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় শক্তি। এই শক্তিকে সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা এবং মূল্যবোধের মাধ্যমে গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় একটি সক্ষম প্রজন্ম তৈরি হতে পারে। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সামনে সেই ভবিষ্যৎ দায়িত্বের কথাই তুলে ধরেন বক্তারা।

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক চিন্তাধারা তৈরি করা প্রয়োজন বলেও মত দেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দশ দিনের এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষে অংশগ্রহণকারীরা নতুন শিক্ষাজীবনে প্রবেশের আগে নিজেদের দক্ষতা ও প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছেন বলে আয়োজকদের আশা। তারা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ভাষাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বক্তাদের মূল বার্তা ছিল, একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সৎ ও দক্ষ নাগরিক, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক পরিবেশ। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের মেধা ও দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শক্তিতেও সমৃদ্ধ হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত