৩ সিদ্ধান্তে দেশ সংকটে, ২ লাখ কোটি লুটের অভিযোগ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৪ বার
৩ সিদ্ধান্তে দেশ সংকটে, ২ লাখ কোটি লুটের অভিযোগ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, ওই সময়ের কিছু সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও জনস্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তার দাবি, সে সময় অন্তত দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট বা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি দাবি করেন।

সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তারেক রহমান এসব অভিযোগ ও প্রশ্ন তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে তিনি বিশেষভাবে তিনটি বিষয়কে সামনে আনেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল, দেশের জন্য তৃতীয় গ্যাস টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ এবং হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে সৃষ্ট পরিস্থিতি—এই তিনটি বিষয় পরবর্তী সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তারেক রহমানের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ, তিনি শুধু কয়েকটি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেননি; এসব সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ, সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন।

গ্যাসের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ সামিটকে বাংলাদেশে তৃতীয় গ্যাস টার্মিনাল নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই উদ্যোগ বাতিল করা হয়।

এ সিদ্ধান্তের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারেক রহমান বলেন, কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে পুরো প্রকল্প বাতিল করার আগে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি কতটা বিবেচনা করা হয়েছিল, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন করে একই ধরনের একটি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিলে বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে আগের উদ্যোগ বাতিলের কারণে দেশ সময় ও সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ হারিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তারেক রহমানের বক্তব্যে বিদ্যুৎ খাতের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তিনি দাবি করেন, ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারত বলে তার দাবি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রকল্পগুলোর মধ্যে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে সংশোধন, পুনর্মূল্যায়ন কিংবা প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল কি না। তার ভাষ্য, সব প্রকল্প একযোগে বাতিল করার সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের শিল্প, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবন এখন বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টিও তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি বলেন, সংক্রামক রোগের বিস্তার, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে প্রাণহানির ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব শুধু একটি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে মানুষের আস্থা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তারেক রহমান দাবি করেন, এসব পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো এবং এর পেছনে কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে থাকলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

তার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে করা অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুটপাট করা হয়েছে অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

এই অর্থ বা সম্পদের উৎস, ব্যবহারের ধরন এবং কারা এর সুবিধাভোগী হয়েছেন—সেসব বিষয়ে জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি জানান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

বন্দর ব্যবস্থাপনার একটি বিষয়ও সামনে আনেন আমজনতার দলের এই নেতা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগে বন্দরের চার্জ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে, সেই সিদ্ধান্তের পেছনে কী ধরনের অর্থনৈতিক বা নীতিগত বিবেচনা কাজ করেছে।

তার দাবি, এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা দরকার।

সামিট এবং তৃতীয় গ্যাস টার্মিনাল প্রসঙ্গেও আরও কিছু প্রশ্ন তোলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান কার্যক্রম অব্যাহত রেখে নতুন একটি প্রকল্প বাতিল করার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও সম্ভাব্য বিদেশি স্বার্থের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান। তার মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ড. ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারেক রহমান। গ্রামীণফোন, গ্রামীণ ব্যাংক এবং বিভিন্ন এনজিও কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছে কি না, সে বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানান তিনি।

গ্রামীণ ব্যাংককে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়ে থাকলে তা কত বছরের জন্য, কোন আইনি কাঠামোর আওতায় এবং কী কারণে দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশের কথাও বলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় নীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই জনগণের আস্থা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত বলে মন্তব্য করেন।

তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে নানা চাপ রয়েছে। গ্যাস আমদানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে তা দেশের সাধারণ মানুষের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি দাবি করেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে কে কী সুবিধা পেয়েছে, কীভাবে পেয়েছে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।

তারেক রহমানের উত্থাপিত অভিযোগগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজনীয় নথি, সরকারি তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে স্বাধীন তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দায়ী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না—এ বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, জ্বালানি প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হলে তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জনগণের অর্থ ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জনআস্থাও শক্তিশালী হয়।

তারেক রহমানের বক্তব্যের পর এসব অভিযোগ ও প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের ব্যাখ্যা কী আসে, সেদিকেও নজর থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com