বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থা ধরে রাখা: রিজভী

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, আন্দোলন ও সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। এখন দল ও সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণের আস্থা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জনগণের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমেই বিএনপিকে এই আস্থা ধরে রাখতে হবে। সরকারের কার্যক্রমে জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।

বিএনপির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে রিজভী বলেন, ৪৮ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দেশের উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীলতার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তার দাবি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বৈদেশিক নীতি, অভ্যন্তরীণ নীতি ও আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিক স্বাধীনতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও জিয়াউর রহমানের অবদান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিএনপির এই নেতা।

তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দলটি তার নীতি, আদর্শ ও দর্শন ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক নীলনকশার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ স্তব্ধ করে দেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া নয় বছর আপসহীনভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি কোনো আপস করেননি এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার ধরে রেখেছেন।

বিএনপিকে ‘ওয়াদা রক্ষাকারী দল’ হিসেবে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও খালেদা জিয়া দল ও দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মধ্যেও বিএনপি ও খালেদা জিয়া রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে রিজভী বলেন, তিনি কারাবাস ও নির্যাতন সহ্য করেও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়া মূল প্রেরণা ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান দলের দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি তার পিতা-মাতার আদর্শ ধারণ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংগঠনকে সক্রিয় করেছেন বলে দাবি করেন রিজভী।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া গণআন্দোলন পরবর্তীতে জুলাই আন্দোলনে রূপ নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটে।

বর্তমান সরকারের কার্যক্রমের প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারেক রহমান কাজ করছেন। সামাজিক সুরক্ষা, উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, সরকারের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত থাকতে পারে। তবে এসব মোকাবিলা করেই সরকার পরিচালিত হচ্ছে। ফার্মার কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতাসহ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি।

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গেও কথা বলেন রিজভী। তিনি বলেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশ বা সরকারের বিষয় নয়; আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণেও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং জ্বালানি বহনকারী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী জানান, সরকার সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দের বাইরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। মহেশখালীর একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের পর গ্যাস রিগ্যাসিফিকেশন পুনরায় শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার তুলে ধরে রিজভী বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক চেতনা, জনগণের সামাজিক সুরক্ষা এবং দেশের উন্নয়ন ও উৎপাদনের লক্ষ্যে ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার ও খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০-এ যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে সকাল ৯টায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে গিয়ে সূরা ফাতেহা পাঠ এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

রিজভীর বক্তব্যে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঐতিহাসিক মূল্যায়নের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সামনে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও উঠে এসেছে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তা ছিল—ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির জন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং অর্জিত জনসমর্থন ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত