প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাভারে আশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে এক তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে নয়ন মন্ডল (৪৮) নামে এক বাসচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে আরও এক নারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ২৫ বছর বয়সী ওই তরুণী চাকরির সন্ধানে গ্রামের বাড়ি থেকে সাভারে এসেছিলেন। থাকার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় পরিচিত এক নারীর দেওয়া আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল তাকে। পরে সেই আশ্রয়কেই কেন্দ্র করে ভয়াবহ ঘটনার অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে ভুক্তভোগী তরুণীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল আলম বুধবার সকালে জানান, তরুণীর করা মামলার ভিত্তিতে নয়ন মন্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই মামলায় শীলা বেগম নামে এক নারীর বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী তরুণী ডিগ্রি পরীক্ষা শেষ করার পর কিছুদিন আগে কর্মসংস্থানের আশায় গ্রামের বাড়ি থেকে সাভারে আসেন। নতুন শহরে কাজের সন্ধানে ঘুরলেও তিনি কোনো চাকরি পাচ্ছিলেন না। থাকার স্থায়ী জায়গাও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে সাভারের আমিনবাজার এলাকার মধুমতি মডেল টাউন এলাকায় ঘোরাঘুরির সময় শীলা বেগম ও তার স্বামী ইমরানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
তরুণীর থাকার জায়গা নেই জানতে পেরে শীলা বেগম ও তার স্বামী তাকে নিজেদের ভাড়া বাসায় থাকার প্রস্তাব দেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কথায় বিশ্বাস করে তরুণী ওই বাসায় গিয়ে অবস্থান নেন। নতুন পরিবেশে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন—এমন ধারণাই তার মধ্যে ছিল বলে মামলার বর্ণনা থেকে জানা যায়।
এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট রাতে শীলার স্বামী ইমরান বাসায় ছিলেন না। ওই রাতে তরুণী শীলা বেগমের সঙ্গে একই কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক ১১টা ২০ মিনিটের দিকে নয়ন মন্ডল ওই কক্ষে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তিনি দরজা বন্ধ করে দেন। মামলায় দাবি করা হয়েছে, ওই সময় শীলা বেগম দরজার কাছে অবস্থান করছিলেন।
এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে শীলা বেগমের সহযোগিতায় নয়ন মন্ডল তরুণীকে ধর্ষণ করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে কাউকে জানালে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক কথা ছড়ানো হবে—এমন হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর তরুণীর মানসিক অবস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, পরে শীলার স্বামী ইমরান বাসায় ফিরে তরুণীকে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি কান্নার কারণ জানতে চাইলে তরুণী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা তাকে জানান। এরপর ইমরান তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।
প্রথমে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ঘটনার বিষয়ে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেন তরুণী। তাদের পরামর্শে তিনি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মঙ্গলবার সকালে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন তিনি।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযুক্ত বাসচালককে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। পরে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে নয়ন মন্ডলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী আদালতে হাজির করা হবে এবং মামলার তদন্তের প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ভুক্তভোগী তরুণীকে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। যৌন সহিংসতার অভিযোগে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধু শারীরিক অবস্থার মূল্যায়নের জন্য নয়, তদন্তের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
ঘটনাটি আবারও কর্মসংস্থানের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসা তরুণীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে। দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন বহু মানুষ কাজের সন্ধানে আসেন। তাদের অনেকেরই পরিচিতজনের সহায়তা ছাড়া থাকার জায়গা, কর্মসংস্থান কিংবা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন জায়গায় অপরিচিত মানুষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে কখনো কখনো তারা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখেও পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়ে আশ্রয় চাইলে তাকে নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার বিষয়টি মানবিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ অপরাধ করলে তার প্রভাব শুধু একজন ভুক্তভোগীর ওপর পড়ে না; এটি সমাজে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে নারীরা যখন কর্মসংস্থানের জন্য নতুন এলাকায় যান, তখন নিরাপদ আবাসন ও সামাজিক সহায়তার সুযোগ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হবে। মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরও আইনি অধিকার রয়েছে এবং আদালতের সিদ্ধান্তের আগে তাকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না।
তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা করা হতে পারে। মামলার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী তরুণীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হলে সামাজিকভাবে তার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের সময় তার নাম, ঠিকানা, কর্মস্থল বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ না করা উচিত, যার মাধ্যমে সহজেই তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়। ন্যায়বিচারের পাশাপাশি একজন ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষাও সংবাদ পরিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সাভারের এই মামলায় এখন পুলিশের তদন্ত এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকে নজর রয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, কার কী ভূমিকা ছিল এবং আইন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। তবে ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয়, আশ্রয় বা সহায়তার নামে কারও দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেওয়া কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক দায়িত্ব এবং দ্রুত আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর পথ আরও শক্তিশালী হতে পারে।