প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপলের নেতৃত্ব দেওয়ার পর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন টিম কুক। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন অ্যাপলের দীর্ঘদিনের হার্ডওয়্যার প্রধান জন টার্নাস। তবে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন শুধু একজন প্রধান নির্বাহীর বিদায় ও আরেকজনের দায়িত্ব গ্রহণের ঘটনা নয়; অনেকের চোখে এটি অ্যাপলের জন্য একটি নতুন প্রযুক্তিযুগের শুরু।
টিম কুক এমন এক সময়ে দায়িত্ব ছেড়েছেন, যখন তাঁর নেতৃত্বে অ্যাপল আকারে, আয়ে ও বাজারমূল্যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এখন জন টার্নাসের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অতীতের সেই বিশাল সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনশীল দৌড়ে অ্যাপলকে কীভাবে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়া যাবে।
অ্যাপলের ঘোষিত নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, টিম কুক এখন নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। অন্যদিকে জন টার্নাস প্রধান নির্বাহী হিসেবে অ্যাপলের দৈনন্দিন নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব সামলাবেন।
কুকের নেতৃত্বে অ্যাপলের যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত করপোরেট সাফল্যের গল্প। তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার সময় অ্যাপলের বার্ষিক বিক্রি ছিল প্রায় ১০৮ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে সেই বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১৬ বিলিয়ন ডলারে। একই সময়ে কোম্পানিটির মুনাফাও চার গুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
স্টিভ জবসের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় টিম কুককে নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে নানা প্রশ্ন ছিল। স্টিভ জবস ছিলেন পণ্য উদ্ভাবন ও নকশার কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে কুকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিচালন দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থা ব্যবস্থাপনা। সময়ের সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেন, অ্যাপলকে শুধু নতুন পণ্য উদ্ভাবনের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আরও বড়, স্থিতিশীল ও লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করা সম্ভব।
তাঁর নেতৃত্বে আইফোন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপডসহ বিভিন্ন পণ্যের বিস্তার ঘটে বিশ্বজুড়ে। হার্ডওয়্যার বিক্রির পাশাপাশি অ্যাপল ডিজিটাল সেবা থেকে নিয়মিত আয়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়। অ্যাপ স্টোর, আইক্লাউড, বিনোদন ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে একটি বিশাল গ্রাহকভিত্তিকে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে কুকের যুগ শুধু সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর নেতৃত্বের সময় অ্যাপলকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনার একটি ছিল নতুন যুগের প্রযুক্তিতে তুলনামূলক ধীরগতি। অনেক সমালোচকের মতে, স্টিভ জবস-পরবর্তী সময়ে অ্যাপল আগের মতো যুগান্তকারী নতুন পণ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।
অ্যাপলের দীর্ঘদিনের বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রকল্প ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০২৩ সালে বাজারে আসা প্রায় ৩ হাজার ৪৯৯ ডলারের ভিশন প্রো হেডসেট প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এসব ঘটনার কারণে প্রশ্ন উঠেছে, স্মার্টফোন-পরবর্তী প্রযুক্তি যুগের জন্য অ্যাপল কতটা প্রস্তুত।
তবে জন টার্নাস দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বর্তমানে প্রযুক্তি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় কোম্পানি এআইকে ভবিষ্যৎ ব্যবসার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখছে। গুগল, মাইক্রোসফটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দ্রুত নতুন এআইভিত্তিক পণ্য ও সেবা তৈরি করছে। এই প্রতিযোগিতায় অ্যাপলের অবস্থান নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে অ্যাপলের ডিজিটাল সহকারী সিরির উন্নত সংস্করণ চালু করতে বিলম্ব হওয়ায় সমালোচনা বেড়েছে। ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশা ছিল, অ্যাপল তার বিশাল হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ইকোসিস্টেমকে কাজে লাগিয়ে এআইয়ের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্রুত অগ্রগতির তুলনায় অ্যাপলকে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকতে দেখা গেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
এই পরিস্থিতিতে জন টার্নাসের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন কোনো এআই ফিচার চালু করা নয়। তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অ্যাপলের ভবিষ্যৎ পণ্য ও সেবার একটি মৌলিক অংশ হয়ে উঠতে পারে। এআইকে শুধু সিরির উন্নত সংস্করণ বা আইফোনের অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।
জন টার্নাস দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। অ্যাপলের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পণ্য উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। অ্যাপল বোর্ডও তাঁর গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং উন্নত পণ্য তৈরির প্রতি মনোযোগকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখেছে।
তাঁর নেতৃত্বে অ্যাপল আবারও পণ্যকেন্দ্রিক উদ্ভাবনের দিকে আরও জোর দেবে কি না, সেটিও প্রযুক্তি বিশ্বের আগ্রহের বিষয়। কুকের যুগে অ্যাপল পরিচালন দক্ষতা, সরবরাহব্যবস্থা ও সেবা ব্যবসায় অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। টার্নাসের যুগে সেই শক্তির সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গতি যুক্ত করা সম্ভব হলে অ্যাপলের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এআইয়ের বাইরে টার্নাসের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা। বহু বছর ধরে অ্যাপলের উৎপাদনের একটি বড় অংশ চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন কৌশল নিতে বাধ্য করেছে।
এই ঝুঁকি কমাতে অ্যাপল ভারতসহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদন সম্প্রসারণ করছে। ভিয়েতনামেও কিছু পণ্য উৎপাদন ও সংযোজনের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য তৈরি বেশির ভাগ আইফোন ভারতে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে উৎপাদন এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া শুধু কারখানা পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দক্ষ কর্মী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, পরিবহনব্যবস্থা এবং উৎপাদন ব্যয়ের মতো জটিল বিষয়। তাই চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি অ্যাপলকে লাভের হার ও পণ্যের মান বজায় রাখার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
এখানেই টিম কুকের অভিজ্ঞতা নতুন ভূমিকায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন এবং বিশেষ করে নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক যখন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তখন কুকের অভিজ্ঞতা অ্যাপলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে থাকতে পারে।
অ্যাপলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন টার্নাস দায়িত্ব নেওয়ার পরই প্রতিষ্ঠানটির সামনে নতুন আইফোনসহ ভবিষ্যৎ পণ্যের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চাপ থাকবে। ৯ সেপ্টেম্বর অ্যাপলের একটি বড় পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠান নির্ধারিত রয়েছে, যা নতুন প্রধান নির্বাহীর নেতৃত্বের প্রথম দিকের বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, টিম কুক অ্যাপলকে যে অবস্থানে রেখে গেছেন, সেটি নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। একটি বড়, লাভজনক এবং বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের দায়িত্ব এখন জন টার্নাসের হাতে। কিন্তু প্রযুক্তি খাতে অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না।
আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এআই। আগামী দিনের প্রযুক্তি কীভাবে বদলাবে, মানুষ কীভাবে ডিভাইস ব্যবহার করবে এবং স্মার্টফোনের পরবর্তী যুগ কেমন হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে অ্যাপলকেও।
কুকের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল অ্যাপলকে আরও বড় ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা। আর টার্নাসের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হতে পারে সেই শক্তিশালী অ্যাপলকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন করে এগিয়ে নেওয়া।
এআইয়ের দৌড়ে অ্যাপল কি আবার উদ্ভাবনের নেতৃত্বে ফিরতে পারবে, নাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ছুটতে থাকবে—আগামী কয়েক বছরেই তার উত্তর মিলবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, টিম কুকের গড়া বিশাল অ্যাপল এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। আর সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম—জন টার্নাস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ।