প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যবসায়ী ও প্রকৃত পর্যটকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ আরও সহজ করতে বর্তমানে চালু থাকা ‘ভিসা বন্ড’ ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং তা সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ যত বাড়বে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও তত বেশি শক্তিশালী হবে। এ কারণে বাংলাদেশের প্রকৃত ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভিসা বন্ড ব্যবস্থা আরও সহজ ও বাস্তবসম্মত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময়, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা, পর্যটন এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সেই সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক ও কার্যকর করার প্রত্যাশা উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বিশেষভাবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনও অত্যন্ত বেশি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষি গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের কৃষি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
জ্বালানি খাত নিয়েও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়নে মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরনের বিনিয়োগ এবং ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং এ খাতের উন্নয়নে আরও মার্কিন বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ কারণে নতুন বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাত নিয়েও রাষ্ট্রপতি কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষতা এ দেশের উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের এই সময়ে প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিখাত এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও বাড়ানো যেতে পারে বলে বৈঠকে মত প্রকাশ করা হয়।
রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহযোগিতার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসহ সংকটের টেকসই সমাধানে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। জবাবে রাষ্ট্রপতি তাকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদার।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে এ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক অবস্থানের কথাও বৈঠকে তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা সম্প্রসারণে বিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার নীতিকে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
আগামী দিনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভিন্ন স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ ধরনের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উভয় দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিগুলোকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক করার সুযোগ রয়েছে।
একটি কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন উভয় দেশই সেখানে নিজেদের স্বার্থ ও সম্ভাবনার প্রতিফলন দেখতে পায়। বাংলাদেশ তার রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
সাক্ষাৎকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
বঙ্গভবনের এই বৈঠক বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বহুমাত্রিক দিকগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। ভিসা বন্ড ব্যবস্থা সহজ করার আহ্বান থেকে শুরু করে কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও রোহিঙ্গা সংকট—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে আলোচনায়।
বিশেষ করে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ সহজ করার আহ্বান দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রত্যাশার প্রতিফলন। এখন ভবিষ্যতে এই আলোচনার বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তব সহযোগিতা ও নীতিগত উদ্যোগে রূপ নেয়, সেদিকেই থাকবে সংশ্লিষ্টদের নজর।