প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতা ও মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুসহ ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। মামলাটি ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে আলোচনা রয়েছে, নতুন করে আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার মধ্য দিয়ে তা আবারও সামনে এসেছে।
মামলার অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত প্রাণহানি, গুলি, নির্যাতন এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঘটনার সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তির সম্পৃক্ততা ছিল। তবে মামলায় আনা অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়া এখনো বাকি।
ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া আসামিদের মধ্যে হাসানুল হক ইনু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় একটি পরিচিত মুখ। তিনি জাসদের সভাপতি এবং সাবেক মন্ত্রী। অন্যদিকে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে পরিচিত। ডা. দীপু মনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুর নামও মামলার আসামির তালিকায় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে অভিযোগ এনেছে, সেগুলো নিয়ে এখন আদালতেই আইনি লড়াই হওয়ার কথা।
মামলার নথি অনুযায়ী, এর আগে শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। শাপলা চত্বরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬১ জন নিহতের একটি তালিকা পাওয়ার কথা মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয় ও মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের দাবি ও তথ্য সামনে এলেও মামলার বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এসব অভিযোগের আইনগত মূল্যায়ন হওয়ার কথা।
মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রূপা এবং মোজাম্মেল বাবু। মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
এ ছাড়া সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। হাসানুল হক ইনু অন্য একটি মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে রয়েছেন এবং সেখান থেকেই তাকে এই মামলায় হাজির করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই মামলায় আবদুর রাজ্জাকের গ্রেপ্তারের কথাও উল্লেখ রয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের কেউ কেউ পলাতক রয়েছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের নথিতে বলা হয়েছে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে দুটি পৃথক মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে আবু বকর সিদ্দিকসহ ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে পরদিন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ছাদেক মিয়াসহ ২০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত আরও কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও অভিযোগের অংশ করা হয়েছে।
শুধু হত্যার অভিযোগেই মামলাটি সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রপক্ষের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে রাশেদুল ইসলাম, আবু ইউসুফসহ আরও কয়েকজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা এবং নির্যাতনের মাধ্যমে গুরুতর আহত করার কথাও বলা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রপক্ষ হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, নিপীড়নসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করেছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিতভাবে নিপীড়ন চালানো হয়ে থাকলে তা আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। শাপলা চত্বর ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য এলাকার ঘটনাগুলোকে সেই আইনি কাঠামোর মধ্যে বিচার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ এবং আসামিপক্ষের সম্ভাব্য বক্তব্য—দুই পক্ষের যুক্তি ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনার পরই আদালত প্রকৃত ঘটনা ও দায় নির্ধারণ করবেন।
শাপলা চত্বরের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ এবং পরবর্তী সময়ে প্রাণহানির খবর নিয়ে তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। নিহতের সংখ্যা, ঘটনার প্রকৃতি এবং অভিযানের ধরন নিয়ে সে সময় বিভিন্ন পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী তথ্য ও দাবি প্রকাশ করা হয়।
বছর পেরিয়ে গেলেও শাপলা চত্বরের সেই রাতের ঘটনাগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি। একদিকে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করে এসেছে। অন্যদিকে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ সত্য উদ্ঘাটনে বিচারিক তদন্ত ও প্রমাণ মূল্যায়নের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির কার্যক্রম এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা আদালতে উপস্থাপিত হবে। আসামিপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য ও আইনি যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপই মামলার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগ এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে দেখা জরুরি। কোনো ব্যক্তিকে আসামি করা বা আদালতে হাজির করা মানেই তিনি অভিযোগে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন—এমন নয়। বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যেক আসামির ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করা হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
শাপলা চত্বর মামলায় একসঙ্গে সাবেক মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, সাবেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তির নাম আসায় মামলাটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখন ট্রাইব্যুনালের শুনানি ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্যতা, প্রমাণের শক্তি এবং আসামিদের ভূমিকা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘ সময় পর শাপলা চত্বরের প্রাণহানির ঘটনায় বিচারিক কার্যক্রমের এই পর্যায় নিহতদের পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছর ধরে যেসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আদালতের নথি, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সেসব প্রশ্নের একটি আইনগত নিষ্পত্তির পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া যেন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রমাণনির্ভর হয়—এটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।