বিমানের সিটের নিচে মিলল ২০ কোটি টাকার স্বর্ণ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
বিমানের সিটের নিচে মিলল ২০ কোটি টাকার স্বর্ণ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাই দুবাইয়ের উড়োজাহাজের সিটের নিচ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউস। উদ্ধার করা হয়েছে ৮০টি স্বর্ণের বার। সব মিলিয়ে এসব বারের ওজন ৯ কেজি ৩৩ গ্রাম এবং আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যাত্রীবিহীন অবস্থায় উড়োজাহাজটিতে বিশেষ তল্লাশি চালিয়ে সিটের নিচে অত্যন্ত কৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় স্বর্ণের চালানটি পাওয়া যায়।

বুধবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এনবিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা ফ্লাই দুবাইয়ের এফজেড৫২৩ নম্বর ফ্লাইটে কাস্টমস কর্মকর্তারা তল্লাশি শুরু করেন। তল্লাশির সময় উড়োজাহাজটিতে কোনো যাত্রী ছিলেন না। বিভিন্ন গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিমানের ভেতরে বিশেষভাবে তল্লাশি চালানো হয়।

তল্লাশির একপর্যায়ে বিমানের ১৯-এ নম্বর সিটের নিচে কালো স্কচটেপে মোড়ানো কিছু বস্তু কর্মকর্তাদের নজরে আসে। প্যাকেটগুলো দেখে সন্দেহ হওয়ায় সেগুলো উদ্ধার করে বিমানবন্দরের কাস্টমস হলে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে নিয়ম অনুযায়ী প্যাকেটগুলো খোলা ও ইনভেন্টরি করা হয়। তখন একে একে ৮০টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। প্রতিটি বারের ওজন ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

স্বর্ণের পরিমাণ এবং বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে পুরো চালানটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিপুল অর্থমূল্যের এই চালানটি কীভাবে উড়োজাহাজের ভেতরে আনা হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং বিমানবন্দরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা কী ছিল—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বর্ণের বারগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে সিটের নিচে লুকানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সরকারি নির্ধারিত শুল্ক ও কর এড়িয়ে এসব স্বর্ণ দেশে আনার উদ্দেশ্য ছিল। পরে কোনো না কোনো পথে চালানটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে বলেও ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত এবং কী উদ্দেশ্যে স্বর্ণগুলো আনা হয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

বিমানবন্দরের মতো কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় একটি উড়োজাহাজের সিটের নিচে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ লুকিয়ে রাখার ঘটনা নতুন করে চোরাচালান প্রতিরোধে নজরদারি ব্যবস্থার গুরুত্ব সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী উড়োজাহাজে পণ্য ও যাত্রী তল্লাশির পাশাপাশি উড়োজাহাজের ভেতরের বিভিন্ন অংশে নিয়মিত ও গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক তল্লাশি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনাও তার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত তল্লাশির কারণেই চালানটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। উড়োজাহাজে কোনো যাত্রী না থাকায় তল্লাশি পরিচালনার সময় কর্মকর্তারা সিট, কেবিনের বিভিন্ন অংশ এবং সম্ভাব্য লুকানোর জায়গাগুলোতে বিশেষ নজর দেন। সেই তল্লাশিতেই ১৯-এ নম্বর সিটের নিচে কালো স্কচটেপে মোড়ানো প্যাকেটগুলো পাওয়া যায়।

উদ্ধারের পর স্বর্ণের বারগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দর কাস্টমসের মূল্যবান গুদামে জমা করা হয়েছে। মূল্যবান ধাতু হিসেবে এসব স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। নিয়ম অনুযায়ী, চোরাচালান বা অননুমোদিতভাবে আনা মূল্যবান পণ্য জব্দ হওয়ার পর সেগুলোর সংরক্ষণ, হিসাব ও পরবর্তী নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় উদ্ধার করা স্বর্ণের নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে।

ঘটনাটিকে শুধু একটি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বিপুল অর্থমূল্যের স্বর্ণের এমন চালান দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি ও পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শুল্ক-কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই নিয়ম এড়িয়ে অবৈধভাবে মূল্যবান ধাতু দেশে প্রবেশ করলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে অবৈধ বাণিজ্যের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন প্রবেশপথে স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে।

এদিকে এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। মামলার মাধ্যমে উদ্ধার করা স্বর্ণের উৎস, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্র এবং চালানটি কীভাবে দেশে প্রবেশ করেছে, সে বিষয়ে আইনগত তদন্তের পথ তৈরি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণ করা যায় না। তাই উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারগুলোর একটি। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে বৈধ বাণিজ্য ও বৈদেশিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিমানবন্দরটির ভূমিকা রয়েছে। ফলে এখানকার নিরাপত্তা ও কাস্টমস কার্যক্রম শুধু চোরাচালান প্রতিরোধের জন্য নয়, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুট থেকে আসা ফ্লাইটে লুকিয়ে স্বর্ণ আনার নানা কৌশল শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ। কখনো যাত্রীর লাগেজে, কখনো শরীরে, আবার কখনো বিমানের বিভিন্ন গোপন স্থানে মূল্যবান ধাতু লুকিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এবারের ঘটনায় সিটের নিচে কালো স্কচটেপ দিয়ে স্বর্ণের বার লুকিয়ে রাখার পদ্ধতিও চোরাচালানকারীদের কৌশলের দিকটি সামনে এনেছে।

ঢাকা কাস্টমস হাউস জানিয়েছে, দেশীয় অর্থনীতি সুরক্ষা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে। উদ্ধার হওয়া ৮০টি স্বর্ণের বার এখন সরকারি হেফাজতে রয়েছে। মামলার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

একটি উড়োজাহাজের সিটের নিচে পড়ে থাকা কয়েকটি কালো প্যাকেট যে প্রায় ২০ কোটি টাকার স্বর্ণের চালান হতে পারে, তা প্রথম দেখায় বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তাদের তল্লাশি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে সেই সন্দেহজনক প্যাকেটই শেষ পর্যন্ত বড় একটি চোরাচালান চালান হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সতর্কতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত