তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
তরুণ উদ্যোক্তাদের ২০ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের উপজেলা পর্যায়ে তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ : উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামে এই কর্মসূচির আওতায় সম্ভাবনাময় তরুণদের ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া হবে। এর অর্ধেক থাকবে ব্যাংকঋণ এবং বাকি অর্ধেক অনুদান হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা তৈরির বাইরে দেশের উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করা এবং তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করা। অনেক তরুণের নতুন ব্যবসার ধারণা থাকলেও প্রাথমিক মূলধনের অভাব, ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতা, জামানতের প্রয়োজনীয়তা কিংবা ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তারা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন না। নতুন এই কর্মসূচির মাধ্যমে সেই বাধাগুলো কিছুটা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ‘উদ্যোগ’ কোনো প্রচলিত প্রতিযোগিতা নয়। বরং তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান ও চিহ্নিত করবে। এরপর আবেদনকারীর ব্যবসায়িক ধারণা, উদ্যোগের সম্ভাব্যতা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন যাচাই করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।

নির্বাচিত উদ্যোক্তার প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার একটি অর্থায়ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হবে। এই প্যাকেজের সর্বোচ্চ অর্ধেক অর্থাৎ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ হিসেবে এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রত্যেক উদ্যোক্তা যে বাধ্যতামূলকভাবে পুরো ২০ লাখ টাকা পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। ব্যবসার ধরন, প্রয়োজনীয় মূলধন এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।

এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না। ফলে যেসব তরুণের ব্যবসা করার আগ্রহ ও সম্ভাবনা থাকলেও জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ জামানত দেওয়ার সুযোগ নেই, তাদের জন্য এটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে পারে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। কর্মসূচির চূড়ান্ত নিয়ম ও শর্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী সার্কুলারে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হবে।

তবে অনুদানের অর্থ পাওয়ার বিষয়টির সঙ্গে ঋণ পরিশোধের শর্তও যুক্ত থাকবে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অর্থও সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়মে শ্রেণীকৃত হয়ে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে ওই উদ্যোক্তা ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বেন। অর্থাৎ কর্মসূচিতে অনুদানের সুবিধা থাকলেও উদ্যোক্তাকে ব্যবসার অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

আবেদনের ক্ষেত্রে বয়স ও বসবাসের নির্দিষ্ট শর্ত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, যার আবেদনের শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর এবং যিনি সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দা, তিনি এই কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারবেন। আগে থেকে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ একজন তরুণের ব্যবসা করার বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় ধারণা থাকলে তিনি নতুন উদ্যোগ নিয়েও এই কর্মসূচির আওতায় আসতে পারবেন।

কর্মসূচিতে সম্ভাব্য ব্যবসার ক্ষেত্রও বেশ বিস্তৃত রাখা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগসহ সব ধরনের বৈধ ব্যবসা বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর ফলে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় সম্পদ, দক্ষতা এবং বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের ব্যবসা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আবেদন প্রক্রিয়াটিও সহজ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আবেদন করতে কোনো ফি দিতে হবে না। সংশ্লিষ্ট উপজেলার অধিবাসী যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদন যাচাইয়ের সময় ব্যবসায়িক ধারণার বাস্তবতা, সম্ভাব্য বাজার, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলার ৬৪টি উপজেলায় কর্মসূচিটি চালু করা হবে। জেলা হিসেবে রয়েছে মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রথম ধাপে নির্বাচিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাগুলোতেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহত্তর পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত। পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় কর্মসূচির কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এতে শুধু নতুন ব্যবসা তৈরিই নয়, উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

তবে অর্থায়ন পাওয়ার পর উদ্যোক্তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যবসাকে টেকসই করা। শুধু মূলধন পেলেই একটি উদ্যোগ সফল হয় না; প্রয়োজন সঠিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার সম্পর্কে ধারণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, পণ্য বা সেবার মান নিশ্চিত করা এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থাও রাখছে।

নির্বাচিত উদ্যোক্তারা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের কাছ থেকে ধারাবাহিক পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা এবং বাজারসংযোগের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য মেন্টরশিপ ও বাজারসংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ব্যবসার শুরুতে পণ্য তৈরি বা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রেতা খুঁজে পাওয়া এবং বাজারে টিকে থাকাও বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে চাকরির পেছনে ছুটে বেড়ানোর পরিবর্তে কিছু তরুণ নিজেরাই ব্যবসা গড়ে তুলে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন, সেবা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বাড়তে পারে।

কর্মসূচির বিস্তারিত বাস্তবায়ন পদ্ধতি, আবেদন প্রক্রিয়া, অর্থায়নের শর্ত ও অন্যান্য নির্দেশনা সংবলিত সার্কুলার আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলার জারির পরবর্তী এক মাস আবেদন গ্রহণ করা হবে। ফলে আগ্রহী তরুণদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিজেদের ব্যবসায়িক ধারণাকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া এবং নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী আবেদন প্রস্তুত করা।

উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরির এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর কার্যকর ভূমিকা, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং উদ্যোক্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘উদ্যোগ’ শুধু অর্থায়ন কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং দেশের তরুণদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়ানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত