বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল, কঠিন পরীক্ষায় বালেন্দ্র শাহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫ বার
বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল, কঠিন পরীক্ষায় বালেন্দ্র শাহ

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভয়াবহ বন্যা, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল এখন উদ্ধার ও ত্রাণের পাশাপাশি বড় এক রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মাস আগে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সামনে এখন দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ। ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষ, ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংকট।

নেপালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের কয়েক দিন পরও শত শত মানুষের মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি হাজারো মানুষ নিখোঁজ ছিলেন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৯০৩ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৪ হাজার ৩৪৭-এ পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সূত্রে প্রাণহানি আরও বেড়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যাও চার হাজারের বেশি রয়েছে।ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে উঠেছে।

দুর্যোগটির উৎপত্তি ও সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়েও এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এর কারণ তখনও পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।  তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে হিমবাহ ও পাহাড়ি অঞ্চলের আকস্মিক জলপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

এই বিপর্যয়ের সময়টি নেপালের রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের নেতৃত্বে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর দেশটির প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবেই ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসেন। কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র হিসেবে ‘বালেন’ নামে পরিচিত শাহ মার্চের নির্বাচনে পরিবর্তন, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ ও রাষ্ট্রীয় সেবার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করেন।

কিন্তু ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে এমন এক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও কঠিন পরীক্ষা। একটি দুর্যোগের সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে সরকারের দৃশ্যমান উপস্থিতি, দ্রুত উদ্ধার, খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা এবং স্বজন হারানো পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। বালেন্দ্র শাহের সরকারের জন্য তাই এই দুর্যোগের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

দুর্যোগের পরপরই শাহ আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। নেপালের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো সক্রিয় করা হয় এবং সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করা হয়। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযানে যুক্ত ছিলেন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষকে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

তবে সরকারের তৎপরতার পাশাপাশি নেতৃত্বের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ে জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বক্তব্য, নিয়মিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা এবং সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরা রাজনৈতিক আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হলেও দুর্যোগের প্রথম কয়েক দিনে তার জনসমক্ষে উপস্থিতি ও সরাসরি বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি অনেক মানুষের মধ্যে কিছুটা আস্থাও তৈরি করেছে।

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা এই সংকটের মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কেউ হারিয়েছেন পরিবারের সদস্য, কেউ এখনো নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায়, আবার অনেকেই এক মুহূর্তে হারিয়েছেন ঘরবাড়ি ও জীবিকার অবলম্বন। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বজনদের কাছে কোনো খবর পৌঁছানোও কঠিন হয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযানের প্রতিটি ঘণ্টা নিখোঁজ মানুষের পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার সময়।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ খাতে। নেপালের অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখেছে। কিন্তু এবারের বন্যায় একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আটটি চালু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোট ২৮১ মেগাওয়াট সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নির্মাণাধীন আরও কয়েকটি প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এতে শুধু তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, নেপালের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বন্যার পানিতে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। চীনের সঙ্গে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যপথও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দুর্যোগের প্রভাব স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর পাশাপাশি রয়েছে পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয়। ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, রাস্তা ও সেতু মেরামত, বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরুদ্ধার, যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। নেপালের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য এই ব্যয় সামলানো সহজ হবে না। ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহায়তা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শাহের সরকারও এখন ধীরে ধীরে উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ থেকে পুনর্বাসনের দিকে মনোযোগ বাড়ানোর কথা জানিয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর শাহ জানান, জীবন রক্ষা, আহতদের চিকিৎসা, ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।  এর অর্থ হলো, সরকারের সামনে এখন কেবল নিখোঁজদের খুঁজে বের করা বা ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ নয়; বরং একটি বিপর্যস্ত অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বও এসে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে। হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন, অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ভবিষ্যতে নেপালের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সাম্প্রতিক বন্যায় জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু আগের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করলেই হবে না; ভবিষ্যতের দুর্যোগ বিবেচনায় নিয়ে আরও সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।

এ কারণে বালেন্দ্র শাহের জন্য এবারের দুর্যোগ একই সঙ্গে সংকট ও সুযোগ—দুই-ই হতে পারে। সংকট, কারণ দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যর্থতা তার নতুন সরকারের প্রতি তৈরি হওয়া আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। আবার সুযোগও বটে, কারণ কার্যকর উদ্ধার, স্বচ্ছ ত্রাণ বিতরণ, দ্রুত পুনর্গঠন এবং দুর্নীতিমুক্ত অর্থ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি তার সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন।

ইতিমধ্যে নেপাল সরকার বিদেশি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়ার উদ্যোগও জোরদার করেছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ দল যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বের মূল্যায়ন হবে শুধু তিনি কত দ্রুত দুর্গত এলাকায় পৌঁছেছেন, তার ওপর নয়। মানুষ কতটা সহায়তা পেয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধানে সরকার কতটা কার্যকর ছিল, ত্রাণ সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছেছে কি না, পুনর্গঠনে কতটা স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় কী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নই তার সরকারের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

নেপালের পাহাড়ি জনপদগুলোতে এখনো বহু পরিবার অপেক্ষা করছে স্বজনের খবরের জন্য। কোথাও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবনের চিহ্ন খোঁজা হচ্ছে, কোথাও ভেঙে যাওয়া সড়ক মেরামতের চেষ্টা চলছে, আবার কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নতুন করে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই কঠিন সময়ে তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সামনে তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার দায়িত্ব নেই; তার সামনে রয়েছে মানুষের আস্থা ধরে রাখা এবং প্রতিশ্রুত পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ দেওয়ার বড় সুযোগ। নেপালের এই কঠিন সময় শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত