প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ যে ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সরকার তা উপলব্ধি করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে দৃশ্যমান উন্নতি আসবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তার বক্তব্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, রিফাইনিং সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ওঠানামা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বাসাবাড়ির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, কলকারখানা এবং সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে শিল্পের উৎপাদন খরচ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এমন বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাসকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের কষ্টের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। তবে এই উন্নতি কতটা দ্রুত এবং কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কার্যকারিতার ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রসঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া রয়েছে। এটি চালু হলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড ওয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ইউনিটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ক্রুড ওয়েল রিফাইন করা সম্ভব হবে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ অপরিশোধিত তেল আমদানির পর দেশে তা পরিশোধনের সক্ষমতা যত বেশি থাকবে, তত বেশি পরিমাণে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা সম্ভব হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে তার প্রভাব কিছুটা সামাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা কমে আসতে পারে বলে আশা করছে সরকার।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন লোডশেডিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমও নিরবচ্ছিন্ন রাখার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের দৈনন্দিন জীবনেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব কমে আসে।
বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে চায় সরকার। যেসব প্রতিষ্ঠান বা গ্রাহক নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে সরকার ভালো দামে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা করতে আগ্রহী।
রুফটপ সোলারের সম্প্রসারণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের বিদ্যুতের চাহিদা স্থানীয়ভাবেই পূরণ করা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের উদ্যোগ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান চুক্তিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে প্রতিমন্ত্রী জানান, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। তার বক্তব্যে বোঝা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি করা জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যতম প্রধান বিষয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতার মতো বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তার প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খরচেও পড়ে। ফলে সরকারের জন্য স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দেওয়া দুই সপ্তাহের সময়সীমা তাই সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সরাসরি যুক্ত। বাসাবাড়িতে রান্না, পানি সরবরাহ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা কিংবা ছোট ব্যবসার কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রয়োজন। শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা উৎপাদন অব্যাহত রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত।
সরকারের পক্ষ থেকে পায়রা ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট, কাতার থেকে জ্বালানি সরবরাহ এবং রুফটপ সোলারকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকটের চাপ কমবে। শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও চায় উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দুই সপ্তাহ সরকারের জন্য বাস্তব পদক্ষেপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার কথা। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিকল্প উৎস সম্প্রসারণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কতটা দ্রুত কমে আসে।