প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃষকের ঘামে উৎপাদিত সবজি, ফলমূল কিংবা অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্য বাজারে তুলতে না তুলতেই নষ্ট হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতা। মৌসুমের শুরুতে কোনো কোনো পণ্যের দাম ভালো থাকলেও উৎপাদন বেড়ে গেলে কয়েক দিনের ব্যবধানে তা নেমে আসে তলানিতে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় তখন অনেক কৃষক লোকসান মেনে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্ষেত থেকে তোলা পণ্য বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়। এমন বাস্তবতায় কৃষকের হাতের কাছে ছোট আকারের আধুনিক হিমাগার স্থাপনের সরকারি উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নেই এখন দেখা দিয়েছে ধীরগতি ও মাঠপর্যায়ে অনাগ্রহের অভিযোগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একটি প্রতিবেদনে সরকারি প্রণোদনায় নির্মাণাধীন ক্ষুদ্র হিমাগার নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাড়া কম পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হিমাগার নির্মাণের অগ্রগতি জানতে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। টাঙ্গাইলের এক কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে রাজশাহী ও ঝিনাইদহের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নিয়েও।
এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক যোগাযোগের ঘাটতি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব হয়তো ধরা পড়বে না। কারণ একটি ক্ষুদ্র হিমাগার কৃষকের কাছে কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি তার উৎপাদিত ফসল কয়েক দিন ধরে রাখার সুযোগ, বাজারদর কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষা এবং প্রয়োজনে লোকসানে বিক্রি না করার একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার। ফলে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হলে বা স্থাপনা যথাযথভাবে তদারকি না হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় কৃষকের প্রত্যাশাকে ঘিরেই।
সরকারি কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় দেশের ২৫ জেলায় ৩২টি ‘ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে পচনশীল কৃষিপণ্য উৎপাদনের মৌসুমে কৃষকদের অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং ফসল সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি করা। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় এই উদ্যোগকে কৃষকের আয় বাড়ানো এবং ফসল-পরবর্তী অপচয় কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অগ্রগতির তথ্য বলছে, বাস্তবায়নের গতি এখনো সন্তোষজনক নয়। সংশ্লিষ্ট তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৩২টি হিমাগারের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র নয়টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রকল্পের ৩০ শতাংশেরও কম কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০টির বেশি হিমাগারের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামে দুটি করে এবং যশোর, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও দিনাজপুরে একটি করে হিমাগারের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে কোথাও নির্মাণসামগ্রী পৌঁছালেও কাজ শেষ হয়নি, কোথাও আবার প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি। নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে নির্মাণসামগ্রী পৌঁছালেও হিমাগার নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। নাটোর ও শরীয়তপুরে কার্যক্রম এখনো প্রক্রিয়াধীন। ফেনীতে নির্মাণসামগ্রী পৌঁছানোর কাজই শেষ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। জামালপুরে স্থাপনা প্রস্তুত হলেও চালু করার জন্য বিদ্যুৎসংযোগের কাজ বাকি রয়েছে। ফলে কাগজে প্রকল্পের অগ্রগতি আর বাস্তবে কৃষকের ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সরকারি প্রণোদনার এই কর্মসূচির পাশাপাশি পৃথক একটি প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ১৮০টি ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের কাজ চলছে। ওই প্রকল্পের মেয়াদ আগামী অক্টোবরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান অগ্রগতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব স্থাপনা শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কাজের গতি বাড়ানো না গেলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে শুধু সময়ই বাড়বে না, কৃষকের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়ার সময়ও পিছিয়ে যাবে।
ক্ষুদ্র হিমাগার নিয়ে সরকারের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে কৃষকের পর্যায়ে ‘Farmers’ Mini Cold Storage’ প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের একটি নতুন মডেল সামনে আসে। কৃষি সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কৃষকের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সাশ্রয়ী সংরক্ষণ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে আরও বড় পরিসরে ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
এ ধরনের হিমাগারের মূল সুবিধা হচ্ছে বড় আকারের প্রচলিত কোল্ড স্টোরেজের তুলনায় কৃষকের উৎপাদনকেন্দ্রের কাছাকাছি সংরক্ষণ সুবিধা তৈরি করা। এতে কৃষককে দূরের হিমাগারে পণ্য নিয়ে যেতে হয় না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি বা ফলমূল কয়েক দিন সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রি করা সম্ভব হলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য বাজারে ওঠার কারণে যে দাম পড়ে যায়, তার প্রভাবও কিছুটা কমানো সম্ভব।
কৃষকের জন্য বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দরকষাকষির ক্ষমতা। মৌসুমের চাপে যখন একই সময়ে অনেক কৃষক একই পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন মধ্যস্বত্বভোগী বা পাইকারি বাজারের ওপর তাদের নির্ভরতা বেড়ে যায়। হাতে সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে কৃষক অন্তত কিছু সময় অপেক্ষা করতে পারেন। এই সময়টুকুই কখনো কখনো উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান বদলে দিতে পারে।
প্রস্তাবিত ক্ষুদ্র হিমাগারগুলোতে আধুনিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তাপমাত্রা ও অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও প্রযুক্তিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি সাধারণ সংরক্ষণকক্ষ নয়; সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে গ্রামীণ কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর একটি নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুদ্র হিমাগার চালুর পর কৃষকের উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ করে পরে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরির খবরও পাওয়া গেছে। জয়পুরহাটের কালাইয়ে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় নির্মিত একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত সবজি কিছু সময় সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমন উদাহরণ দেখায়, অবকাঠামো বাস্তবে চালু হলে এর সুফল সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
তবে একটি স্থাপনা নির্মাণ করাই শেষ কথা নয়। সেটি সময়মতো নির্মাণ, মানসম্মত যন্ত্রপাতি স্থাপন, বিদ্যুৎ বা বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষকের জন্য সহজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর যদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে সরকারের বড় বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণোদনার অধীনে নির্মিত ক্ষুদ্র হিমাগারগুলোতে কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করা হবে এবং মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকেও কাজের তদারকি হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, অর্থ নয়ছয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকায় কিছু কর্মকর্তা এ ধরনের প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এসেছে। এটি সত্য হলে বিষয়টি কেবল একটি প্রকল্পের ধীরগতি নয়; সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক মানসিকতা এবং কৃষকের প্রয়োজনের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে। অবশ্য এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া গেলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হবে।
কৃষি উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু বড় বাজেটের প্রকল্প কিংবা নির্মিত অবকাঠামোর সংখ্যায় মাপা যায় না। একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পেলেন কি না, ফসল নষ্ট হওয়ার আগে সংরক্ষণ করতে পারলেন কি না এবং উৎপাদনের ঝুঁকি সামলে আয় ধরে রাখতে পারলেন কি না—সাফল্যের আসল মাপকাঠি সেখানেই।
তাই ২৫ জেলার ৩২টি ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব স্থাপনার কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলো প্রকৃতপক্ষে কৃষকের ব্যবহারে এসেছে কি না, কোথায় কী কারণে কাজ আটকে আছে এবং মাঠ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে অগ্রগতি প্রকাশ এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা যেতে পারে।
কারণ একজন কৃষক যখন ভরা মৌসুমে কম দামের আশঙ্কায় তার কষ্টের ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখন কয়েক দিনের সংরক্ষণক্ষমতাও তার কাছে বড় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হয়ে উঠতে পারে। সেই নিরাপত্তার জন্যই ক্ষুদ্র হিমাগারের স্বপ্ন। এখন সেই স্বপ্ন যেন নির্মাণের ধীরগতি, প্রশাসনিক অনাগ্রহ কিংবা তদারকির দুর্বলতায় আটকে না থাকে—সেটিই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।