বাম্পার ফলনেও নওগাঁর কৃষকের মুখে হাসি নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
বাম্পার ফলনেও নওগাঁর কৃষকের মুখে হাসি নেই

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ধানের মাঠজুড়ে এবার ছিল আশানুরূপ ফলনের প্রত্যাশা। আউশ ধানের শীষে শীষে ভরে উঠেছিল নওগাঁর বিস্তীর্ণ মাঠ। কৃষকের আশা ছিল, ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারেও মিলবে কাঙ্ক্ষিত দাম। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার পর সেই আশায় যেন ধাক্কা লেগেছে। জেলার বিভিন্ন হাটে আউশ ধানের দর নেমে এসেছে মণপ্রতি ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায়। উৎপাদন খরচের তুলনায় এই দাম এতটাই কম যে অনেক কৃষকের পক্ষে মূলধনও ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

নওগাঁ দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা। স্বাভাবিকভাবেই ধানের ফলন ভালো হলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমন প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু এবার মাঠে ফলনের সাফল্য বাজারে এসে কৃষকের আর্থিক স্বস্তিতে রূপ নিচ্ছে না। বরং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে ক্রেতার সংকট এবং ধানের দরপতন মিলিয়ে কৃষকের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা।

জেলার বিভিন্ন হাটের সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দেখা যাচ্ছে, জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের ধান তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও জিরাশাইলের মণ ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, কাটারি ৯০০ থেকে ৯৬০ টাকা এবং ব্রি-২৮ ৮০০ থেকে ৮২০ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে। কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার অনেক ক্ষেত্রে প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। অথচ একই সময়ে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচ বেড়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল প্রায় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এবার আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টরে। অর্থাৎ কৃষকেরা আউশ আবাদে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং আবাদি জমির পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় সেই সাফল্য এখন অনেক কৃষকের জন্য আর্থিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে প্রায় ৬৪ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিঘাপ্রতি হিসাব করলে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার টাকা। অথচ অনেক কৃষকের প্রতি বিঘায় ফলন হচ্ছে ২০ থেকে ২২ মণ। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী সেই ধান বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচই পুরোপুরি উঠে আসছে না।

এই হিসাবের সঙ্গে কৃষকের বাস্তব জীবনের চাপ যোগ করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ধান বিক্রি করেই অনেক কৃষককে কৃষিঋণ বা সমিতির ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। কারও দিতে হয় জমির বর্গা বা ইজারার টাকা, কারও ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসার ব্যয়। ফলে দাম কম জেনেও ধান ঘরে রেখে দেওয়ার সুযোগ অনেকের নেই। প্রয়োজনের তাগিদে তাঁরা বাধ্য হচ্ছেন কম দামে ফসল বিক্রি করতে।

মহাদেবপুরের ধানের হাটে এমনই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন স্থানীয় কৃষক আনোয়ার হোসেন। তিনি ১০ মণ জিরাশাইল ধান বাজারে নিয়ে এসেছিলেন। বাজারে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। ধান বাজারে আনার জন্যও প্রতি মণে ভ্যানভাড়া দিতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গত বছর যেখানে আউশ ধান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন, এবার সেখানে অনেক কম দাম পাচ্ছেন। ফলে ভালো ফলন হলেও তাঁর কাছে এবারের মৌসুম স্বস্তির নয়।

নিয়ামতপুরের কৃষক সেলিম হোসেনের পরিস্থিতিও একই রকম। তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ ধান চাষ করেছেন তিনি। চাষের খরচ মেটাতে ঋণও নিয়েছেন। প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ফসল ঘরে তুললেও বাজারদর কমে যাওয়ায় এখন ঋণ পরিশোধ এবং সংসারের ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাঁর মতো বর্গাচাষিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন, কারণ জমির মালিকের পাওনা পরিশোধের পর উৎপাদন ব্যয়ের অর্থ উদ্ধার করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

ধানের বাজারে দরপতনের পেছনে শুধু সরবরাহ বাড়াকে দায়ী করছেন না সংশ্লিষ্টরা। চালকল মালিকদের ভাষ্য, আগের মৌসুমে দেশে ধানের ভালো উৎপাদন হয়েছে। একই সঙ্গে চাল আমদানির কারণে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত তৈরি হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে এবং চালকলগুলোতে বিক্রিও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। ফলে মিলাররা ধান কেনার ক্ষেত্রে আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাটের ধানের দামে।

নওগাঁর বাজারে এমন বৈপরীত্যও দেখা যাচ্ছে, যেখানে কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করছেন, কিন্তু চালের বাজারে একই হারে দাম কমছে না। ধান থেকে চাল তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ের খরচ, পরিবহন, মজুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে ধানের দাম এবং চালের খুচরা দামের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে কৃষকের প্রশ্ন হলো, উৎপাদনের ঝুঁকি যিনি নিচ্ছেন, বাজারের দরপতনের সবচেয়ে বড় চাপটিও কেন তাঁকেই বহন করতে হবে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ধানের বাজার নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও বাম্পার ফলনের পরও কৃষকের আয় কমেছে, আবার কোথাও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সামান্য লাভও কৃষকের কাছে টেকসই মনে হয়নি। নওগাঁর মতো বড় ধান উৎপাদনকারী এলাকায় এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষকের ভবিষ্যৎ আবাদ পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি মণ আউশ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে কৃষক উৎপাদন ব্যয় মিটিয়ে কিছুটা লাভ করতে পারতেন। এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বর্তমান বাজারদর এবং কৃষকের কাঙ্ক্ষিত ন্যায্য দামের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম কৃষকের জন্য একটি বিকল্প বাজার তৈরি করতে পারে। চলতি মৌসুমে নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি উদ্যোগে কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে ধান সংগ্রহের কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে। তবে বাজারে কৃষকের উৎপাদনের পরিমাণের তুলনায় সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক যদি সময়মতো সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় ধান বিক্রির সুযোগ না পান, তাহলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় হাটের দামের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদনের পর বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে। ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের হাতে যখন দ্রুত নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, তখন বাজারে ক্রেতা কমে গেলে তিনি দরকষাকষিতে দুর্বল হয়ে পড়েন। এ সময় সরকারি সংগ্রহ, গুদাম সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং স্থানীয় বাজার নজরদারি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

কারণ ধানের দাম কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু একজন কৃষকের ঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষকের আয় কমলে গ্রামের দোকান, পরিবহন, শ্রমবাজার থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতির নানা খাতেই তার প্রভাব পড়ে। একজন কৃষক যখন লোকসানে ধান বিক্রি করেন, তখন পরবর্তী মৌসুমে সার, বীজ, শ্রমিক কিংবা সেচের খরচ জোগাড় করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।

নওগাঁর মাঠে এবার তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাম্পার ফলনের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কার ঘরে? কৃষকের পরিশ্রম, সময় ও বিনিয়োগের যথাযথ মূল্য যদি বাজারে না মেলে, তাহলে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে কৃষির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন। কৃষকের মুখে হাসি ফেরাতে প্রয়োজন এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে উৎপাদন থেকে বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় থাকবে। নওগাঁর বর্তমান ধানের বাজার সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত