১৮ কোটি মানুষের পক্ষে রাস্তায় নেমেছি: ডা. শফিকুর রহমান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
১৮ কোটি মানুষের পক্ষে রাস্তায় নেমেছি: ডা. শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজনৈতিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক দাবিকে সামনে রেখে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার সকালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে কর্মসূচির উদ্বোধনী সমাবেশের আগে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই কর্মসূচি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়; দেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকারের পক্ষে তারা রাজপথে নেমেছেন।

লংমার্চকে ঘিরে এরই মধ্যে রাজধানী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান থেকে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার পরও প্রত্যাশিত সমাধান না হওয়ায় তারা রাজপথে কর্মসূচি নিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ কর্মসূচি নিয়ে কী ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া আসে, সেটিও পর্যবেক্ষণে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরুর আগে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুর রহমান বলেন, তাদের দাবিগুলো ইতোমধ্যে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘোষিত দাবির পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানকেও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার ভাষায়, দেশের মানুষ চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে অতিষ্ঠ এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। জোটের নেতারা এসব দাবিকে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন।

আগস্টের শুরুতে ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা ও সিলেট অভিমুখে ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এর প্রথম কর্মসূচি হিসেবে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের দিন নির্ধারণ করা হয়। পরে কর্মসূচি সফল করতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রস্তুতি সভা, প্রচার ও সমন্বয় কার্যক্রম চালানো হয়। জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপ্তি হওয়ার কথা।

কর্মসূচি ঘিরে জোটের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। লংমার্চের যানবাহনের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এলেও শেষ পর্যায়ে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে প্রায় এক হাজার করার কথা জানিয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে শুভেচ্ছা জানানোর আহ্বানও জানানো হয়।

শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক একটি তরুণকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি ‘সিফাত’ নামের এক তরুণের গ্রেপ্তার ও তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বলেন, ওই তরুণের ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে তিনি একমত নন। তবে যে বিষয়ে ওই তরুণ প্রতিবাদ করেছেন, সে বিষয়ে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে দেশের মানুষ তার প্রতিবাদের প্রতীকী রূপ ধারণ করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে।

এ সময় তিনি অতীতের কয়েকটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের উদাহরণ টেনে সরকারকে সতর্ক করেন। তার বক্তব্যে নূর হোসেন, ইয়াসমিন ও ডা. মিলনের নাম আসে। তিনি বলেন, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে তার পরিণতি নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সতর্ক থাকা উচিত। তবে তার এসব বক্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত এবং এর বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর।

শফিকুর রহমান আরও বলেন, তাদের কর্মসূচি জনগণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো বাধা তাদের গন্তব্য থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না। তিনি লংমার্চের যাত্রাপথে নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ কামনা করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে কর্মসূচি সফল ও নিরাপদ করার জন্য দোয়া চান।

তার বক্তব্যে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও জনভোগান্তির কথা উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, নাগরিকরা বিভিন্ন সেবার ঘাটতি অনুভব করলেও সংশ্লিষ্ট বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে তিনি দাবি করেন।

লংমার্চের রাজনৈতিক গুরুত্ব শুধু একটি দিনের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। কারণ ১১ দলীয় ঐক্য ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর আরও কয়েকটি বিভাগীয় শহরমুখী কর্মসূচির ঘোষণা রয়েছে। ফলে শনিবারের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, এর ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে একটি বড় রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চলাচল ও জনদুর্ভোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক। বিপুলসংখ্যক যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করলে স্বাভাবিক যান চলাচলে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে আয়োজকেরা কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ রাখার পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রশাসনের দায়িত্বও হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখা।

১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা তাদের দাবিগুলোকে জনগণের অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তবে কোনো রাজনৈতিক জোটের দাবির গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সেই দাবিগুলোর প্রতি জনগণের বাস্তব সমর্থন, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর। ফলে লংমার্চে কত মানুষের অংশগ্রহণ হয় এবং কর্মসূচির পর সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, তারা জনগণের জন্য রাজপথে নেমেছেন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের ভেতরেও জনগণের দাবিগুলো তুলে ধরা হবে।

এদিকে ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের পর ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-খুলনা ও ঢাকা-সিলেট অভিমুখী কর্মসূচিও রয়েছে। অর্থাৎ এই লংমার্চকে জোটটি একটি বৃহত্তর ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদীঘি পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং বর্তমান সময়ে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্কেরও একটি দৃশ্যমান প্রকাশ। এখন এই কর্মসূচি কতটা জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে পারে, সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব কমে নাকি আরও বাড়ে এবং ঘোষিত দাবিগুলোর বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়—সেদিকেই নজর থাকবে দেশবাসীর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত