প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় অভিযুক্তদের কেউ কেউ আবারও বাইরে বেরিয়ে একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে ফেরার সুযোগ বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
শনিবার সকালে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির উদ্যোগে আয়োজিত ‘আমার শহর, আমার দেশ—পরিচ্ছন্নতায় বদলে যায় বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মাদক ও ছিনতাই প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইজিপি বলেন, মাদক ও ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যক্তিকে একাধিকবার আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা সম্ভব হয় না। পরবর্তী সময়ে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে অপরাধ দমনে শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান পরিচালনাই যথেষ্ট নয়, আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানোও জরুরি।
আইজিপির এই বক্তব্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ও ছিনতাই নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। নগরের ব্যস্ত সড়ক, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ছিনতাইয়ের ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। একইভাবে মাদকের বিস্তার শুধু অপরাধ পরিস্থিতিকেই জটিল করে না, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি করে বড় ধরনের সামাজিক শঙ্কা।
মাদককে একটি পরিবার ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট হিসেবে উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, মাদক নতুন প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক নানা আকর্ষণীয় নামে তরুণদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কখনো এসব মাদককে এনার্জি ট্যাবলেট বা অন্য কোনো নিরীহ পণ্যের মতো করে উপস্থাপন করা হয়। ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
মাদকাসক্তির প্রভাব যে শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা তুলে ধরে নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথাও বলেন আইজিপি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকের কারণে একটি পরিবারের ভেতরেও ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এমন ঘটনাও তিনি দেখেছেন, যেখানে মাদকের টাকা না দেওয়ায় সন্তান নিজের বাবাকে মারধর করেছে। এ ধরনের ঘটনা মাদকাসক্তির সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতির গভীরতাই প্রকাশ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। কারণ শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদকের চাহিদা পুরোপুরি কমানো সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংগঠন ও সামাজিক নেতৃত্বকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও তথ্যভিত্তিক অভিযান প্রয়োজন।
আইজিপি এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে পুলিশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় এক হাজার মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। এত বিপুল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে হবে।
জনবান্ধব পুলিশিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশের কার্যক্রম হতে হবে জনগণকেন্দ্রিক। সাধারণ মানুষের প্রতি পুলিশকে আরও মানবিক ও জনবান্ধব হতে হবে। তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণের সহযোগিতাও প্রয়োজন। পুলিশের একার পক্ষে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
আইজিপির বক্তব্যে উঠে আসে অপরাধ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক কারণগুলো নিয়েও কাজ করা। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সামাজিক উদ্যোগ এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে তরুণদের যুক্ত করা গেলে তাদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। আইজিপি বলেন, শুধু প্রচারের জন্য নয়, বাস্তব পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন। রাজধানীর পরিবেশের উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নিজের শহর ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমেদও পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে ঢাকাজুড়ে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে। একটি পরিচ্ছন্ন শহর শুধু প্রশাসনের উদ্যোগে সম্ভব নয়; নগরবাসীকেও এর অংশীদার হতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি নগরকে সবুজ রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর মতে, শহরকে নিজের ঘরের মতো মনে করলে নাগরিকদের আচরণেও পরিবর্তন আসবে। যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা এবং প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
ঢাকার বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত চাপের প্রসঙ্গও অনুষ্ঠানে আলোচনায় আসে। নগরের পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য শহর রেখে যেতে হলে এখন থেকেই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নগরবাসীর সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক আরও কার্যকর করার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়। অপরাধ দমন ও নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা গেলে তথ্য আদান-প্রদান ও অপরাধ প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে সেই সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ও পুলিশের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ এবং মানবিক আচরণ—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠান শেষে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে একটি নিমগাছ রোপণ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নের কর্মসূচিকে প্রতীকীভাবে সামনে আনা হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থী, পরিবার ও নগরবাসীর দৈনন্দিন আচরণের অংশ হয়ে উঠবে।
মাদক, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও আইজিপির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো প্রয়োজন। অপরাধীরা যাতে আইনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে বারবার একই অপরাধে ফিরতে না পারে, সে জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো, পেশাদার তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, ছিনতাই বা অপরাধের তথ্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার মতো উদ্যোগগুলো সম্মিলিতভাবে একটি নিরাপদ সমাজ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশের ভাষায়, নিরাপদ ও সুন্দর শহর গড়ার দায়িত্ব কেবল পুলিশের নয়—এটি সমাজের প্রতিটি মানুষেরও দায়িত্ব।