তালাবদ্ধ ঘরে স্বামী-স্ত্রী ও নবজাতকের মরদেহ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২ বার
তালাবদ্ধ ঘরে স্বামী-স্ত্রী ও নবজাতকের মরদেহ

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাভারের আশুলিয়ায় একটি ভাড়া বাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে স্বামী-স্ত্রী ও এক নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিন ধরে ঘরটির দরজা-জানালা বন্ধ থাকলেও বিষয়টি নিয়ে আশপাশের মানুষের মধ্যে তেমন সন্দেহ তৈরি হয়নি। পরে কক্ষ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা খুলে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

শনিবার ভোরে আশুলিয়ার মধ্য জামগড়া এলাকার হাজী হযরত আলীর মালিকানাধীন চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, মৃত পুরুষ ও নারী স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই বাসাটি ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। তাদের সঙ্গে থাকা শিশুটিকে নবজাতক বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘটনাটি সামনে আসে মূলত দুর্গন্ধের কারণে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কক্ষের দরজা-জানালা প্রায় সব সময় বন্ধ থাকত। শুক্রবার রাতে কক্ষের ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে তারা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কক্ষের দরজা খুলে ভেতরে তিনজনের মরদেহ দেখতে পায়।

মরদেহগুলো বেশ কিছুদিন পড়ে থাকায় অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধারের কয়েক দিন আগেই তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ঠিক কবে, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঘটনাটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে মৃত পুরুষের গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় মরদেহ পাওয়াকে কেন্দ্র করে। এ কারণে পুলিশ বিষয়টিকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে দেখছে না। এটি হত্যাকাণ্ড কি না, কিংবা ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো কারণ জড়িত রয়েছে কি না—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দলের সদস্যরাও যান। তারা কক্ষের ভেতর থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। তদন্তের ক্ষেত্রে এসব আলামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কক্ষের দরজা কীভাবে তালাবদ্ধ ছিল, বাইরে থেকে কেউ তালা দিয়েছিল কি না, ভেতর থেকে বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা ছিল কি না, ঘরে কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা অস্বাভাবিকতার চিহ্ন ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুলিশের জন্য নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করাও এখন বড় একটি কাজ। তারা কোথা থেকে এসেছিলেন, কতদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করছিলেন, তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজন আশপাশে ছিলেন কি না এবং শেষবার কখন তাদের জীবিত দেখা গিয়েছিল—এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বাসার মালিক ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কক্ষ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে তিনজনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে নিহত দুজনকে স্বামী-স্ত্রী বলে ধারণা করা হলেও তাদের পরিচয় ও ঠিকানা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক রাসেল হোসেন জানান, কয়েক দিন আগেই তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

একটি পরিবার একই কক্ষে এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে কয়েক দিন পড়ে রইল—এ প্রশ্নও স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে। শহর ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক আশুলিয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। অনেক পরিবারই কর্মস্থল ও জীবিকার প্রয়োজনে নিজ জেলা থেকে দূরে এসে তুলনামূলক অপরিচিত পরিবেশে বসবাস করে। ফলে কোনো পরিবার বা ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক দিন যোগাযোগ না থাকলেও অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নজরে আসে না। এই ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি করুণ দিক সামনে এনেছে।

বিশেষ করে একটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। পৃথিবীতে আসার পর শিশুটির জীবন কতটুকু সময় স্থায়ী হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য নিশ্চিত হয়নি। তার মা-বাবার সঙ্গে শিশুটির মৃত্যু কীভাবে ঘটল, সে প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিশুটির জন্মের পর চিকিৎসা হয়েছিল কি না, পরিবারটির আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, তাদের সঙ্গে কারও বিরোধ বা যোগাযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

তবে ঘটনাটির মানবিক দিকের পাশাপাশি আইনগত দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেবল প্রাথমিক সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযোগ আরোপ করা হলে তদন্তের স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পুলিশও এখন পর্যন্ত কাউকে দায়ী না করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের কথা বলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা।

আশুলিয়ায় সাম্প্রতিক সময়েও তালাবদ্ধ ঘর থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্টে একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশি তদন্তে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন ও একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। আবার একই এলাকায় স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের একাধিক সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও অতীতে ঘটেছে। ফলে নতুন এই ঘটনাটিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি নগর ও শিল্পাঞ্চলের ভাড়াবাসায় বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো ঘটনাস্থলের আলামত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং নিহতদের পরিচয় দ্রুত নিশ্চিত করা। পরিচয় শনাক্ত হলে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হবে। সেই তথ্যের সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক ফলাফল মিলিয়ে দেখলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও বিস্তারিত তথ্য নেওয়া প্রয়োজন। নিহত পরিবারটি কবে বাসা ভাড়া নিয়েছিল, তাদের সঙ্গে নিয়মিত কারা যোগাযোগ করতেন, শেষবার কখন তাদের দেখা গিয়েছিল, কোনো অস্বাভাবিক শব্দ বা ঘটনা কেউ শুনেছিলেন কি না—এসব তথ্য তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ থাকলে সেটিও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

সবশেষে, তিনটি প্রাণের এই মর্মান্তিক পরিণতির প্রকৃত কারণ দ্রুত উদ্‌ঘাটনই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তবে দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর যদি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু ঘটে থাকে, তাহলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া জরুরি। অন্ধকার একটি তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহ শুধু একটি পরিবারের করুণ পরিণতির গল্প নয়; এটি এমন এক প্রশ্নও সামনে এনেছে—একটি পরিবার কয়েক দিন নিঃশব্দে হারিয়ে গেলেও কেন তাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ ছিল না? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তদন্তকে হতে হবে তথ্যনির্ভর, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত