বস্ত্র খাতে লেনদেনের উত্থানে চমক শেয়ারবাজারে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
বস্ত্র খাতে লেনদেনের উত্থানে চমক শেয়ারবাজারে

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে লেনদেনের চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে বস্ত্র খাতের শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহ বাজারের সামগ্রিক লেনদেনকে নতুন গতি দিয়েছে। সপ্তাহজুড়ে এ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে তুলনামূলক বেশি হাতবদল হয়েছে এবং দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০২ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে এই খাতে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্ত্র খাতে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা, যা প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। বাজারের মোট লেনদেনে এই খাতের এমন উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র কোম্পানির শেয়ারের প্রতি নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে সায়হাম টেক্সটাইলের শেয়ারে। কোম্পানিটির দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৩২ কোটি টাকা। এরপর ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ ও মালেক স্পিনিং। উভয় কোম্পানির দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২৬ কোটি টাকা করে। সায়হাম কটনের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে; কোম্পানিটির দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ২৩ কোটি টাকা।

বাজারের শীর্ষ লেনদেনকারী কোম্পানিগুলোর তালিকাতেও বস্ত্র খাতের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। সপ্তাহ শেষে ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া পাঁচ কোম্পানির মধ্যে চারটিই ছিল বস্ত্র খাতের। বাকি একটি ছিল আর্থিক খাতের কোম্পানি আইপিডিসি। ফলে শুধু খাতভিত্তিক লেনদেনের পরিমাণ নয়, বাজারের সবচেয়ে সক্রিয় কোম্পানিগুলোর মধ্যেও বস্ত্র খাতের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বস্ত্র খাতের শেয়ারে বাড়তি লেনদেনের প্রভাব পড়েছে পুরো বাজারের দৈনিক গড় লেনদেনেও। গত সপ্তাহে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন হয়েছে প্রায় ৬০৯ কোটি টাকা। এর আগের সপ্তাহে এ পরিমাণ ছিল ৫৭২ কোটি টাকা। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৩৭ কোটি টাকা বা প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ।

তবে লেনদেনের এই বৃদ্ধি বাজারসূচকে বড় ধরনের উত্থান ঘটাতে পারেনি। সপ্তাহের শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও সূচকের গতিপথ ছিল তুলনামূলকভাবে স্থির। এর অন্যতম কারণ ছিল বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও দরপতনের মধ্যে প্রায় ভারসাম্য থাকা।

সপ্তাহ শেষে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ১৮৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৭০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমেছে। ফলে একদিকে যেমন বেশ কিছু শেয়ারে ক্রয়চাপ ছিল, অন্যদিকে অনেক শেয়ারে বিক্রির চাপও অব্যাহত ছিল। এই ভারসাম্যই বাজারসূচকের বড় ধরনের পরিবর্তনকে সীমিত রেখেছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক এই চিত্রে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ কৌশলেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন এক খাতের শেয়ার থেকে মুনাফা বা মূলধন সরিয়ে অন্য খাতের তুলনামূলক সক্রিয় শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। ফলে বাজারে সামগ্রিক অর্থের প্রবাহ থাকলেও সব খাত সমানভাবে সেই অর্থের সুবিধা পাচ্ছে না।

বিশেষ করে যেসব খাতের শেয়ার সূচকের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলে, সেসব খাত থেকে কিছু অর্থ সরে গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম সূচক-প্রভাবশালী কোম্পানির শেয়ারে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে কোনো কোনো খাতে লেনদেন বাড়লেও সামগ্রিক সূচকে তার প্রতিফলন খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বস্ত্র খাতের উত্থানকে এ ধরনের খাত পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার শেয়ারবাজারে সূচকের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখা খাতগুলোর একটি ব্যাংক খাত। কিন্তু গত সপ্তাহে ব্যাংক খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এ খাতের দৈনিক গড় লেনদেন নেমে এসেছে প্রায় ৫১ কোটি টাকায়। আগের সপ্তাহে ব্যাংক খাতে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৫৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে এ খাতে দৈনিক গড় লেনদেন কমেছে প্রায় ৬ কোটি টাকা, যা ৯ শতাংশেরও বেশি।

বাজারের এ পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় ও লেনদেননির্ভর কোম্পানির দিকে নজর দিচ্ছেন। তবে কোনো একটি খাতে হঠাৎ লেনদেন বেড়ে যাওয়াকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবণতার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শেয়ারবাজারে লেনদেনের উত্থান-পতনের পেছনে কোম্পানির আর্থিক ফলাফল, ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় কাজ করে।

বস্ত্র খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পভিত্তিক খাত। এ খাতের অনেক কোম্পানি রপ্তানি, উৎপাদন, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হলে তা বাজারে আলাদা গুরুত্ব পায়। তবে শেয়ারের লেনদেন বাড়ার সঙ্গে কোম্পানির মৌলভিত্তি বা ব্যবসায়িক সক্ষমতার উন্নতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও অন্যান্য মৌলিক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহের বাজারচিত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও সূচকের উত্থান সীমিত থাকা। এটি একদিকে বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগের অর্থ বিভিন্ন খাত ও কোম্পানির মধ্যে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতাও তুলে ধরছে। বস্ত্র খাতের শক্তিশালী লেনদেন এবং ব্যাংক খাতের লেনদেন কমে যাওয়ার পার্থক্য সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করেছে।

আগামী সপ্তাহগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে কি না, সেটিই এখন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্ত্র খাতের লেনদেন যদি ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী থাকে, তাহলে এ খাত বাজারের সক্রিয় খাতগুলোর একটি হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকসহ বড় সূচক-প্রভাবশালী খাতগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তার ওপরও বাজারসূচকের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে গত সপ্তাহের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে বস্ত্র খাতের লেনদেনে। বাজারের মোট লেনদেন বৃদ্ধিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সূচকের বড় উত্থান হয়নি। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বাজারে বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম বাড়লেও তারা আগের মতো একই খাতে কেন্দ্রীভূত না থেকে সুযোগ ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর করছেন। আগামী দিনের বাজারে এই প্রবণতা কতটা স্থায়ী হয়, তার ওপরই শেয়ারবাজারের পরবর্তী গতিপথের একটি বড় অংশ নির্ভর করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত