জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আমদানির সম্ভাব্য নতুন উৎস খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার। প্রয়োজন হলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। শনিবার সকালে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে প্রচলিত উৎসের পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার দিকেও নজর দিচ্ছে সরকার।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহপথের ঝুঁকি এবং বিভিন্ন দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতির পরিবর্তন জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনেক দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে সরবরাহের বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আফ্রিকা থেকেও জ্বালানি আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। নতুন উৎস খোঁজার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের সম্ভাব্য পরিবর্তন বা কোনো একটি অঞ্চলে সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি যুক্ত। শিল্পকারখানার উৎপাদন, পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। ফলে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার উদ্যোগকে শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহ উৎসের বৈচিত্র্য, আমদানির সক্ষমতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয়টি সেই বৃহত্তর জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আফ্রিকা থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনার কথাও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিপুল জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য নতুন সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে আমদানির ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে নতুন উৎস থেকে আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, পণ্যের মান, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের রপ্তানি খাতেও বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, পোশাক খাতের পণ্যের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য নিয়ে সরকার জোরেশোরে কাজ করছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই নির্ভরতা কমিয়ে নতুন ও সম্ভাবনাময় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের ঐতিহাসিক পরিচিতি রয়েছে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি বিশ্ববাজারে আগ্রহ বাড়ার প্রেক্ষাপটে পাটভিত্তিক পণ্যের নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। কাঁচা পাটের পাশাপাশি বহুমুখী পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং বিভিন্ন ধরনের মূল্য সংযোজিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, নকশা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং নতুন বাজারে বিপণন জোরদার করা প্রয়োজন।

রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নতুন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পণ্য ও উৎপাদন সক্ষমতার ইতিবাচক পরিচিতি তুলে ধরতে কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এবারের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সেখানে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।

জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ—এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে নতুন সরবরাহকারী, নতুন বাজার এবং নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজে নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরার প্রয়োজনও বাড়ছে।

বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তার সময়ে একটি দেশের জন্য জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রপ্তানি আয়ের উৎসকে বৈচিত্র্যময় করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি পণ্য বা নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে বৈশ্বিক চাহিদা বা বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তনের সময় অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে। তাই পোশাকের পাশাপাশি পাটসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করা, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে। একইভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির সমন্বয় প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজার যে বার্তা এসেছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করার প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়।

জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে শিল্প ও পরিবহনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে অনিশ্চয়তা কমতে পারে। অন্যদিকে পাট ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হলে রপ্তানি আয়ের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে সরকারের সামনে একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্যে জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। প্রয়োজন হলে আফ্রিকা থেকে জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা এবং পোশাকের পাশাপাশি পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। জাতিসংঘ অধিবেশনকে সামনে রেখে এসব বিষয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা কতটা এগোয়, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত