রাষ্ট্রপতির প্রথম সফর ঘিরে উৎসবের আমেজ ঠাকুরগাঁওয়ে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
রাষ্ট্রপতির প্রথম সফর ঘিরে উৎসবের আমেজ ঠাকুরগাঁওয়ে

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঠাকুরগাঁওয়ে যেন এখন অপেক্ষার প্রহর। জন্মভূমির সন্তান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা সফরে আসছেন। আগামীকাল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) শুরু হচ্ছে তাঁর দুই দিনের ঠাকুরগাঁও সফর। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তাঁর নিজ জেলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ সফরকে ঘিরে জেলার মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।

রাষ্ট্রপতির সফরকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও শহর ও আশপাশের এলাকায় চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রধান সড়ক, গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়কের আইল্যান্ড এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি কোথাও কোথাও করা হচ্ছে রং ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। শহরের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাতে স্থানীয়ভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজনকে ঘিরে প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়; তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, পারিবারিক স্মৃতি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে এই জেলার নিবিড় যোগ রয়েছে। ফলে একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর প্রথম নিজ জেলা সফরকে স্থানীয় মানুষের অনেকেই আবেগ ও গর্বের একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে শহরজুড়ে যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা—দুই ধরনের অনুভূতিই কাজ করছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, রোববার সকালে হেলিকপ্টারযোগে রাষ্ট্রপতি ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে তাঁর অবতরণের কথা রয়েছে। সেখান থেকে তিনি জেলা সার্কিট হাউসে যাবেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা রয়েছে।

সার্কিট হাউসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রপতি যাবেন শহরের সেনুয়াপাড়ার পারিবারিক কবরস্থানে। সেখানে তিনি তাঁর বাবা সাবেক মন্ত্রী মরহুম মির্জা রুহুল আমীন ও মা ফাতেমা বেগমের কবর জিয়ারত করবেন। রাষ্ট্রপতির নিজ জেলা সফরের এই অংশটি বিশেষভাবে আবেগঘন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে এসে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত তাঁর সফরে একটি ব্যক্তিগত ও মানবিক মাত্রা যোগ করবে।

কবর জিয়ারতের পর রাষ্ট্রপতি শহরের কালীবাড়িতে তাঁর নিজ বাসভবনে যাবেন। সেখানে দুপুরের খাবার গ্রহণ ও কিছু সময় বিশ্রামের পর বিকেলে তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। স্থানীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনাকে দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও নাগরিক অভ্যর্থনার আবহে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে অনুষ্ঠানস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকায় রয়েছেন—এ বিষয়টিও স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজ বাসভবনে ফিরে যাবেন। সেখানে গণ্যমান্য ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। প্রথম দিনের কর্মসূচি শেষে তাঁর নিজ বাসভবনেই রাত্রিযাপনের কথা রয়েছে।

সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অবকাঠামো প্রকল্প। ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের এই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকে জেলার শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উত্তরাঞ্চলের একটি অপেক্ষাকৃত সীমান্তঘেঁষা জেলার উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা কী হবে, সেটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রত্যাশাও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার জন্য জেলার শিক্ষার্থীদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও সুযোগ বাড়লে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিজ এলাকায় থেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে সীমিতসংখ্যক অতিথির উপস্থিতি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে রাষ্ট্রপতি নিজ বাসভবনে ফিরে দুপুরের খাবার গ্রহণ ও বিশ্রাম করবেন। পরে তিনি জেলা সার্কিট হাউসে যাবেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে ঠাকুরগাঁও ত্যাগ করার কথা রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অনুষ্ঠানস্থল, রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের সম্ভাব্য পথ এবং আশপাশের এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সফরের দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনুষ্ঠানস্থল ও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা সমন্বয়ের পাশাপাশি যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহের আরেকটি কারণ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক পথচলার সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের সম্পর্ক। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে জেলার মানুষের সঙ্গে তাঁর যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সফর সেই সম্পর্ককে নতুন একটি প্রেক্ষাপটে সামনে নিয়ে এসেছে।

তবে উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সফরের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আয়োজক কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কর্মসূচিগুলো সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ যেন শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দুই দিনের ঠাকুরগাঁও সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নয়, তাঁর জন্মভূমির মানুষের জন্যও একটি আবেগঘন প্রত্যাবর্তন। একদিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার নিজ জেলায় আগমন, অন্যদিকে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত, নাগরিক সংবর্ধনায় মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন—সব মিলিয়ে সফরটি ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। রাষ্ট্রপতিকে একনজর দেখতে এবং নিজেদের এলাকার সন্তানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দেখে গর্বিত হতে এখন অপেক্ষায় জেলার মানুষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত