জ্বালানি সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, তেল মজুত ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
জ্বালানি সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, তেল মজুত ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা এসপিআরের মজুত নেমে গেছে ২৮৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে। ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুতের সর্বনিম্ন স্তর। সর্বশেষ এক সপ্তাহেই মজুত কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ছে। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বড় ধরনের ধাক্কা সামাল দেওয়া, বাজারে তেলের ঘাটতি কমানো এবং ভোক্তাদের ওপর জ্বালানি মূল্যের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে মজুত থেকে তেল বের করে দেওয়ার ফলে এখন উল্টো প্রশ্ন উঠছে—জরুরি পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত তেল অবশিষ্ট থাকবে তো?

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ মূলত কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক তেলভান্ডার নয়। এটি দেশের জরুরি পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় মজুত। লুইজিয়ানা ও টেক্সাসের উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ লবণগুহায় এই তেল রাখা হয়। এসব মজুতের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেল। বর্তমান ২৮৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল সেই সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশের সমান।

সত্তরের দশকের জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলগত রিজার্ভ গড়ে তোলে। আরব তেল নিষেধাজ্ঞার কারণে তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ব্যাপক জ্বালানি সংকটে পড়েছিল। ভবিষ্যতে কোনো যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা বড় ধরনের সরবরাহ বিপর্যয় দেখা দিলে যাতে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি অচল হয়ে না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই এই রিজার্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বর্তমান সংকটের মাত্রা বোঝা যায় মজুত কমার ধারাবাহিকতা দেখলে। চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে কৌশলগত রিজার্ভ থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার অনুমোদন দেয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলো সম্মিলিতভাবে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল সবচেয়ে বড়গুলোর একটি।

মার্চে ঘোষিত এই কর্মসূচির আওতায় তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই এসপিআরের ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছিল, ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেলের এই কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মে মাসে আরও প্রায় ৫৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের জন্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথাও জানানো হয়। ফলে জরুরি মজুত থেকে তেল বের হওয়ার গতি আরও বাড়ে।

এর প্রভাব শুধু সরকারি মজুতের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে পেট্রলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ডিজেলের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। পরিবহন, কৃষি, উৎপাদন এবং পণ্য সরবরাহের মতো খাতগুলো জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে অর্থনীতির অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পরিবহনের বড় একটি অংশ সড়কপথে হওয়ায় ট্রাক, কৃষিযন্ত্র ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় সরাসরি জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়িতে জ্বালানি ভরার খরচই বাড়ে না; খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতির নতুন আশঙ্কা। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং তার প্রভাব পণ্যের দামেও পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে প্রচেষ্টা চলছে, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সেটিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়লে এই চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি হয়। ওই অঞ্চলের তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ ঘাটতির সম্ভাবনা ধরে নিয়ে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাজারে এমন চাপ তৈরি হয়েছে।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বল্পমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল রাখা এবং একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত মজুত পুনর্গঠন করা। কারণ এসপিআর থেকে তেল ছাড়লে তাৎক্ষণিক সরবরাহ সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও মজুত দ্রুত কমে যায়। আর মজুত কমে গেলে ভবিষ্যতের কোনো বড় সংকটে সরকারের হাতে বাজারে হস্তক্ষেপের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মজুত পুনরায় পূরণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহার করে কৌশলগত রিজার্ভ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তবে ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য এসপিআরের বিদ্যমান মজুতের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে সরাসরি তেল ভরার পরিবর্তে তেল বিনিময়ের মতো ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে এই উদ্যোগের সুফল দ্রুত পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন তেল সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধ চলাকালীন দ্রুত মজুত কমে যাওয়ার যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা কম।

এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দাম বেড়ে গেলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও এসপিআর থেকে বড় পরিমাণ তেল ছাড়ার অনুমোদন দিয়েছিলেন। সেই সময় ছয় মাসে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এই জরুরি রিজার্ভ ব্যবহারের কারণে মজুতের ওপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত কমে যাওয়ার একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেতও। বিশ্বের বৃহৎ তেল উৎপাদক দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক তেলবাজারের অস্থিরতা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, সরবরাহপথে নতুন বাধা তৈরি হলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়লে দেশটির কৌশলগত রিজার্ভের ওপর চাপ আরও তীব্র হতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, জরুরি মজুতের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অপ্রত্যাশিত সংকটে শেষ ভরসা হিসেবে কাজ করা। সেই মজুত যদি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে দ্রুত কমতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো নতুন সরবরাহ বিপর্যয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের হাতে আগের তুলনায় কম বিকল্প থাকবে। ফলে ইরান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব শুধু বর্তমান জ্বালানি বাজারে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত