প্রকাশ: ১১ আগস্ট ‘২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ প্রকৃতির অফুরন্ত নিয়ামতে সমৃদ্ধ এক দেশ। পাহাড়, নদী, সমুদ্র থেকে শুরু করে বনভূমি—প্রতিটি কোণায় সৃষ্টিকর্তার অসীম দান লুকিয়ে আছে। তবে এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল বরাবরই বিশেষভাবে পরিচিত তাদের অনন্য সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের জন্য। সিলেটের পাহাড়ি ঝরনা, নদীর স্রোতধারা এবং সবুজে মোড়া প্রান্তর যেন প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুর স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মণিমুক্তার মধ্যে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরকে অনায়াসে সবার শীর্ষে রাখা যায়।
কখনও জাফলং ছিল পর্যটকদের সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের অপূর্ব শোভা জাফলংয়ের জনপ্রিয়তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সাদা পাথরের আশপাশের নীলাভ-সবুজ পানি, পাহাড়ের পাদদেশ বেয়ে আসা স্বচ্ছ স্রোত এবং গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপে এই শীতল পানিতে স্নান—সবই যেন এক অপার্থিব আনন্দের স্বাদ দেয়। একবার যে এই পানিতে ডুব দিয়েছে, তার কাছে পৃথিবীর অন্য কোনো জলাধারের আকর্ষণ আর তেমন মনে হয় না।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই বিনামূল্যে পাওয়া প্রকৃতির অমূল্য উপহার আজ হুমকির মুখে। পাথরের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার সংরক্ষণ না করে সেটিকে অবৈধভাবে আহরণ ও বিক্রির ব্যবসায় পরিণত করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার দেওয়া নেয়ামতকে বিনষ্ট করার এই প্রবণতা কেবল নৈতিক অবক্ষয় নয়, এটি জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের এক নগ্ন দৃষ্টান্ত। এই অবৈধ ব্যবসায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। মানুষের নৈতিকতা যখন এই পর্যায়ে নেমে আসে যে, তারা দেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য লুটে নিতে দ্বিধা করে না, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত লোভ নয়, বরং গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ সিলেটের মতো একটি প্রমিনেন্ট অঞ্চলে দিনের পর দিন অবৈধ পাথর আহরণ ও পাচার চলতে থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নজরদারির অভাব এই অবৈধ কর্মকাণ্ডকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দায়ও সমানভাবে থেকে যায়। তারা চাইলে আইন প্রয়োগ ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এই অপরাধচক্র ভেঙে দিতে পারতেন।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে, সিলেটের জনগণ নিজেরাই এই অপকর্মের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছেন না। যে অঞ্চলের মানুষ তাদের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের জন্য গর্ববোধ করে, সেই অঞ্চলে প্রকাশ্যে এমন সম্পদ লুট চললেও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর খুব কম শোনা যায়। স্থানীয়দের সচেতনতা ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছাড়া এই অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আমাদের প্রতিবেশী ভারত মেঘালয় ও অন্যান্য রাজ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সংরক্ষণে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। তারা সযত্নে পাহাড়, নদী, পাথর ও বনভূমি রক্ষা করে পর্যটনকে উন্নত করেছে এবং প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে টিকিয়ে রেখেছে। আমরা যদি এখনই সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নেই, তবে ভবিষ্যতে হয়তো এই অঞ্চলের সৌন্দর্য কেবল স্মৃতিতেই রয়ে যাবে।
এখনই সময়, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সিলেটের মানুষকে একসাথে দাঁড়িয়ে এই অবৈধ পাথর ব্যবসার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানানোর। কারণ প্রকৃতি একবার ধ্বংস হলে তাকে পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব। আমাদের গর্বের সিলেটকে রক্ষা করতে হলে আজই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—নইলে আগামী প্রজন্মকে আমরা কেবল হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের গল্পই শোনাতে পারব।