বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি, প্রাণে বাঁচলেন ১৪ জেলে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪১ বার
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবি, প্রাণে বাঁচলেন ১৪ জেলে

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার শেষে উপকূলে ফেরার সময় প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে বরগুনার তালতলী উপজেলার একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে গেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ফকিরহাট এলাকার কাছাকাছি সাগরে ঘটে এ দুর্ঘটনা। ট্রলারে থাকা ১৪ জেলেই শেষ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার হওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছে জেলেদের পরিবারগুলো। তবে দুর্ঘটনার পরও ডুবে যাওয়া ট্রলারটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্য এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। প্রতিকূল আবহাওয়া, উত্তাল ঢেউ এবং হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য জেলে জীবিকার সন্ধানে গভীর সমুদ্রে যান। বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনাটিও সেই ঝুঁকিপূর্ণ জীবনেরই আরেকটি বাস্তব চিত্র হয়ে সামনে এসেছে। সৌভাগ্যক্রমে অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেদের দ্রুত উদ্ধার তৎপরতায় এবার ১৪টি পরিবার তাদের স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আশা ধরে রাখতে পেরেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফকিরহাট এলাকা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে সাগরে মাছ ধরার ট্রলার ‘এফবি মায়ের দোয়া’ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। মাছ শিকার শেষে উপকূলের দিকে ফেরার সময় সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যায় এবং একপর্যায়ে পানিতে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার সময় ট্রলারে ১৪ জন জেলে ছিলেন।

ডুবে যাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই জেলেদের সামনে তৈরি হয় বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের মধ্যে ট্রলার থেকে ছিটকে বা পানিতে পড়ে তারা ভাসতে থাকেন। অন্ধকার নেমে আসার পর তাদের উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। তবে সাগরে থাকা অন্য জেলেরা দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন।

পরে রাত প্রায় ১০টার দিকে ‘সেলিম মাঝি’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার সাগরে ভাসমান অবস্থায় থাকা ১৪ জেলেকে দেখতে পায়। এরপর তাদের একে একে ট্রলারে তুলে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় সাগরের পানিতে থাকার পরও সবাইকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উদ্ধার হওয়া জেলেদের মধ্যে ১৩ জন তালতলী উপজেলার বাসিন্দা। অপর একজন সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

উদ্ধারকারী ট্রলারের মাঝি রাজু মিয়া জানান, রাত ১০টার দিকে সাগরে ভাসতে থাকা ১৪ জেলেকে তারা দেখতে পান। এরপর কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত তাদের উদ্ধার করা হয়। সবাইকে অক্ষত অবস্থায় ট্রলারে তোলা সম্ভব হয়েছে। তবে তখনও সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারটির কাছে গিয়ে সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উপকূলের ফকিরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ঘাটে থাকা জেলে ও ট্রলার মালিকরা দ্রুত উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। যারা সাগরে ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দুর্ঘটনাস্থলের দিকে ট্রলার পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অন্য একটি ট্রলারের মাধ্যমে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ১৪ জেলের সন্ধান মেলে এবং তাদের নিরাপদে তুলে নেওয়া হয়।

ফকিরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মজিবর ফরাজী বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ঘাটে থাকা জেলেদের ট্রলার পাঠানো হয়। উদ্ধারকারী দল দ্রুত সাগরে গিয়ে ১৪ জেলেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

তবে উদ্ধার অভিযান সফল হলেও ডুবে যাওয়া ট্রলারটির বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। উত্তাল সাগরের কারণে দুর্ঘটনার পর ট্রলারটি ঠিক কোথায় ডুবে গেছে এবং সেটির বর্তমান অবস্থান কী, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ট্রলারটির সন্ধানে আরও কার্যকর অভিযান চালানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ট্রলারডুবিতে কোনো প্রাণহানি হয়নি। উদ্ধার হওয়া ১৪ জেলে নিরাপদে রয়েছেন। তাদের দ্রুত উপকূলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারটির মালিক তালতলীর নিদ্রা এলাকার জাফর মিয়া। বুধবার ১৪ জন জেলেকে নিয়ে ট্রলারটি সাগরে মাছ ধরতে যায়। মাছ শিকারের পর বৃহস্পতিবার তারা উপকূলে ফেরার পথে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে পড়েন। সাগর উত্তাল হয়ে যাওয়ায় ট্রলারটি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি উল্টে গিয়ে ডুবে যায়।

উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনে মাছ ধরা শুধু একটি পেশা নয়, এটি হাজারো পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস। প্রতিদিন অসংখ্য জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যান। তাদের আয় নির্ভর করে সাগরের মাছ, আবহাওয়া এবং নিরাপদে ফিরে আসার ওপর। একটি ট্রলার দুর্ঘটনার শিকার হলে শুধু কয়েকজন জেলের জীবনই ঝুঁকিতে পড়ে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাদের পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ।

তালতলীর মতো উপকূলীয় এলাকায় অনেক পরিবারে একজন বা একাধিক সদস্য মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। সাগরে যাওয়ার সময় স্বজনরা যেমন আশায় থাকেন, তেমনি আবহাওয়া খারাপ হলে উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে। ট্রলারডুবির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার রাতেও ১৪ জেলের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এমনই আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা কোনো নিশ্চিত খবর না পাওয়ায় স্বজনদের উদ্বেগ আরও বাড়ছিল। রাতের অন্ধকারে উত্তাল সাগরের মধ্যে তাদের ভেসে থাকার খবর ছিল অত্যন্ত শঙ্কার। শেষ পর্যন্ত অন্য একটি ট্রলারের মাধ্যমে সবাই জীবিত উদ্ধার হওয়ার সংবাদ স্বজনদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।

সাগরে মাছ ধরার সময় আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা মেনে চলার বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় জেলেদের জন্য দ্রুত আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছে দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাগরে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা এবং মাছ ধরার ট্রলারগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি না হলেও ডুবে যাওয়া ট্রলারটি জেলে ও মালিকের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি মাছ ধরার ট্রলার শুধু একটি নৌযান নয়; এর সঙ্গে মালিকের বিনিয়োগ, জেলেদের কর্মসংস্থান এবং একটি পরিবারের আয়ের পথ জড়িয়ে থাকে। তাই দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ট্রলারের সন্ধান ও সম্ভব হলে সেটি উদ্ধারের উদ্যোগও সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, উত্তাল বঙ্গোপসাগরের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ভেসে থাকার পরও ১৪ জেলেই জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। তাদের দ্রুত উদ্ধারে সাগরে থাকা অন্য জেলেদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুর্যোগের মুহূর্তে এক জেলে আরেক জেলের পাশে দাঁড়ানোর এই মানবিক সহযোগিতা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, সাগরের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে পারস্পরিক সহায়তাই অনেক সময় বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে।

এখন উদ্ধার হওয়া জেলেদের নিরাপদে উপকূলে ফিরিয়ে আনা এবং ডুবে যাওয়া ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের সন্ধান করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান কাজ। পাশাপাশি এমন দুর্ঘটনা এড়াতে আবহাওয়ার সতর্কতা, নিরাপদ নৌযান চলাচল এবং জেলেদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া প্রতিটি জেলের নিরাপদে ঘরে ফেরা শুধু একটি পরিবারের স্বস্তি নয়, উপকূলীয় জনপদের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত