গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় জামায়াত আমির

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪১ বার
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় জামায়াত আমির

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গণভোটের রায়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে উল্লেখ করে সেই রায় বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। জনরায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। গণভোটের রায় কার্যকর করা হলে সরকার ও সংসদ উভয়েই সম্মানিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মাগরিবের বিরতির পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে প্রায় ৪৫ মিনিট বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, দুর্নীতি দমন, মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন, পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, শিল্প ও কৃষি খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজের দলের অবস্থান তুলে ধরেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান দেখানোর এখনো সুযোগ রয়েছে। তার মতে, অতীতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএনপি সম্মানিত হয়েছে। এবার জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দলটি আরও একবার সম্মানিত হতে পারে। একই সঙ্গে পুরো সংসদের মর্যাদাও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন, প্রাণহানি, নির্যাতন, মামলা, গুম ও নানা ধরনের ত্যাগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ একটি পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছে। জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কনসেন্সাস কমিশনের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আলোচনা ও মতবিনিময় হয়েছে। এসব আলোচনার ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও কার্যকারিতা পাওয়া গেলেও গণভোটের বিষয়টির এখনো পূর্ণাঙ্গ সুরাহা হয়নি। তার মতে, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তারা কোনো দলীয় শাসন চাননি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা। তবে সেই সরকারে যেন আবার ফ্যাসিবাদী প্রবণতা তৈরি না হয়, কোনো ধরনের বৈষম্য না থাকে এবং সাধারণ মানুষের জীবন যেন রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে বিপন্ন না হয়, সে জন্যই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন।

সংস্কার ও সংশোধনের পার্থক্য তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সাধারণ সংশোধনের মাধ্যমে কোনো আইন পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে আদালতে সেটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কিন্তু গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে কোনো কাঠামোগত আইন তৈরি হলে সেটির অবস্থান ভিন্ন হবে বলে তিনি মনে করেন। রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি স্থায়ী ও কার্যকর পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন।

বক্তব্যে তিনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তার দাবি, ওই আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। তবে সাবেক ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, যারা নিজেদের নির্দোষ মনে করেন, তাদের আইনের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত ছিল।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ভারতের অবদান স্বীকার করলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশকে হতাশ করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই সৎ ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা, তিস্তার পানিবণ্টন এবং গঙ্গা-পদ্মার পানি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোর সমাধানেও তিনি গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি সরকারের প্রতি আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। তিনি সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিবেশীসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ওপর জোর দেন।

সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়েও আপত্তি জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি আইনটিকে কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে রাষ্ট্রপতিকে এতে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আইনটি পুনর্বিবেচনার আগে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের মতামত নেওয়ার প্রস্তাব দেন।

তিনি বলেন, আইনটি সংসদে পাস হলেও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের প্রসিদ্ধ আলেমদের মতামত নেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি মত দেন। অতীতে সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে কোরআন-সুন্নাহর বিপরীতে কোনো আইন করা হবে না বলে দেওয়া বক্তব্যের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

দুর্নীতি প্রসঙ্গেও সরব ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার দাবি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর লাগাম টেনে ধরা জরুরি। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেতৃত্ব প্রয়োজন। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব দেখতে চান বলেও জানান তিনি।

মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, দেশের মানুষ একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করছে। চাকরি ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হলে তরুণ সমাজ হতাশ হতে পারে।

চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের কাঠামো পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এ নিয়ে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতি বজায় রেখে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান জানান তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় আনুকূল্যের পরিবর্তে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার আহ্বানও জানান।

সংসদকে আরও কার্যকর ও সহনশীল করার ওপরও গুরুত্ব দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশকে বিভক্ত করে রাজনীতি পরিচালনা করতে চান না তারা। বরং বিভিন্ন মত ও রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে চান। সংসদে তাদের বক্তব্য যৌক্তিক ও শালীন হবে এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকার নীতির কথাও জানান তিনি।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তার মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও উভয় খাতেই নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার কথা বলেন। তার দাবি, জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মালিক নয়, শ্রমিক, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে আসে। কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার দাবি জানান তিনি। কৃষক উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য না পেলে কৃষি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে বলে তিনি মনে করেন।

সংসদে নারী সদস্যদের ভূমিকা ও সুযোগ নিয়েও কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, নারী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে। সংরক্ষিত নারী সদস্যদের আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি এবং তাদের নিজ নিজ দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন তিনি।

নিজ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কলেজের সংকটের কথাও বক্তব্যে তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। একই সঙ্গে ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এরই মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান হওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদও জানান তিনি।

দীর্ঘ বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান আবারও জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দেন। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও বিভাজন ও ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে যুক্তি, শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন, মেধার মূল্যায়ন, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি—বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রত্যাশা স্পষ্ট হয়েছে। এখন এসব রাজনৈতিক বক্তব্য ও দাবির কতটা বাস্তব রূপ পায় এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত